গুরুদেবের বর

মাতৃ করুনার মূর্ত প্রতীক স্বর্ণগাভীর রক্ষক ও একমাত্র বৈধ পূজারী গুরুদেবের কাছে অনেক কান্নাকাটি করে একটি বর চেয়েছিলাম। একটি দিনের জন্য হলেও পৃথিবীর সত্যরুপ দেখবো। পুজা শেষ হয়ে গেলে চুপিসারে সেদিন স্বর্ণগাভীর সামনে যাই, নিজ মুখে মনের বাসনা ব্যাক্ত করবো বলে। মাতার মায়াময় চোখ দেখে আমার মন করুনায় প্লাবিত হয়। ধুপের গন্ধে চারিদিক আচ্ছন্ন ছিল। চন্দন আর কদমের সুবাস আমার চেতনা আচ্ছন্ন করেছিল। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি আর চোখের সামনে স্বর্ণগাভীকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। প্রার্থনাগৃহের খোলা ছাদ দিয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম অসীমের দিকে। এমন সময় আশ্চর্য এক আলো  আমার  মাথার উপর পতিত হল। কোমল নীল আলো। আমাদের দলপতি বলেছিলেন প্রার্থনাগৃহে এমন নীল আলো কেবল নির্বাচিত কারো উপরেই এসে পড়তে পারে। এবং সেই নির্বাচিত জনই নির্ধারণ করবে পুরুষের ভাগ্য এবং পুরুষ নির্ধারণ করবে নারীর ভাগ্য। কিন্তু একি! এ আলো আমায় প্লাবিত করছে ক্যানো?! কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমি জ্ঞান হারাই। যখন ঘুম ভেঙ্গে জাগলাম তখন দেখি বেশ কয়েকটি উদগ্রীব মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওদের চিনতে পারলাম। গুরুদেব ইব্রাত ও তাঁর সঙ্গীরা। আমার মেরুদণ্ডের একেবারে নীচে আর মাথার দুটি স্থানে খুব ব্যাথা করছিল। ব্যাথাটা এতটাই প্রবল যে আমি বাকি সবার চেহারার একটা বড় পরিবর্তন লক্ষ্যই করলামনা। চোখ বুজে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বর্ণ গাভীর মুণ্ডুপাত করলাম। “করুনার মূর্ত প্রতীক হলেও সেতো স্ত্রী শক্তিরই রুপ তাই এই দশা!” কিছুক্ষণ পরে সিদ্ধান্ত সভায় সবাইকে ডাকা হল। যথারীতি পুরুষেরা সামনে সারিবদ্ধভাবে আর তাঁর পেছনে নারীরা। দল বেধে যখন যাচ্ছি তখনি চোখে পড়লো এক অভিনব ব্যাপার! সবগুলো পুরুষ অধিবাসীদের পেছনে একটি করে লেজ এবং তা তাঁরা মহানন্দে দোলাচ্ছেন। আশ্চর্যতো! এ কি করে সম্ভব?! এটা কি উপাসনার নতুন কোন কৌশল? নাকি নতুন কোন রোগ? রোগ হলেত তো ঔষুধির সন্ধানে বেরুতে হয়। দেখিতো আমিও আক্রান্ত হয়েছি কিনা? মনের মাঝে এই আলোচনা করতে করতে নিজের পেছনে তাকাই। মেরুদণ্ড দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল। গুরুদেব ইব্রাত আর বাকি সব পুরুষদের মত আমারও একটি লেজ! আমি ছুটে গেলাম অন্যান্য পুরুষ নেতাদের কাছে, অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম তাঁদের মাথার উপরকার দুটো শিং কে। আশ্চর্যতো! একটি গোত্রের সকল পুরুষ নেতারা শিং উঁচিয়ে, লেজ নাড়িয়ে অভিজাত ভঙ্গীতে জাবর কেটে যাচ্ছে অথচ কেউ খেয়ালই করছেনা?! ব্যাপারটা কি? আমি কি জেগে আছি নাকি স্বপ্ন দেখছি?! কুল কুল করে আমি ঘামতে লাগলামঃ তবে কি স্বর্ণ গাভী আমার বর মঞ্জুর করেছিলেন?! এটাই কি পৃথিবীর সত্যরুপ? আমরা অর্থাৎ তাবৎ পুরুষ সম্প্রদায় তাহলে গরু?! আমি আবারো জ্ঞান হারালাম, মাটিতে লুটিয়ে পরার আগে শুনতে পেলাম আমার রাখাল বন্ধুদের হাম্বা হাম্বা ডাক।

 

  • যতদূর মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষে থাকা কালে গল্পটা লিখেছিলাম। আলোকচিত্রের টেকনিকের প্রথম ক্লাসের, প্রথম অ্যাসাইনমেনটের একটা অংশ ছিল গরু নিয়ে একটা লেখা তৈরি করা। গল্পটা পড়ে শোনাবার পর এক সহপাঠী বলেছিলেন গল্পটা “অসুস্থ” (পুরো লাইন মনে নাই)। তাঁর সাথে আদর্শগত সংঘাত আমার জারি ছিল। ভাবছি এই লেখা নিয়ে আরও কিছু কুৎসিত কিছু মন্তব্য হয়তো করা হবে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে আমার কিছুই বলার নাই, বিষয়টা ক্লান্তিকরও। কেবল বলতে চাই কল্পনার শৃঙ্খল খুলে স্বপ্ন রাজ্যে বিচরন করার অধিকার আমাদের সবার আছে।