তোমার কন্যাদ্বয়ের যেন তোমার মত প্রেমিক না জোটে!

বসন্তের এই কোমোল রোদে তোমাকে তোমার বৌয়ের সাথে হাঁটতে দেখে আমাদের সময়গুলো মনে পরে গেল। বয়সে সাত/আট বছরের ছোট ছিলাম বলেই কি আমার প্রতি তোমার আকর্ষণ ছিল? একবার এক কিশোরী ফেসবুকে তোমাকে বন্ধু করেছিল বলে আবেগে আহ্লাদিত হয়ে বলেছিলে “মেয়েটাকে একটা ধন্যবাদ দিতে হবে”। আগে বুঝতামনা এখন বুঝি অল্প বয়সের নারীসঙ্গ পুরুষকে তারুন্যের অনুভূতি দেয়, তাই চিরতরুন থাকার উপায় হিসেবে তোমার মত পুরুষেরা কাঁচা বয়সের নারীসঙ্গ খোঁজে প্রতিনিয়ত। মানুষের কাছে শুনতাম, নিজেও বোলে-চালে বুঝিয়ে দিতে তুমি অনেক ধনী। তোমার এক নারী বন্ধুকে তুমি ল্যাপটপ উপহার দিয়েছিলে, জানতে পারি তখন যখন কিভাবে গিফট র‍্যাপ করবে সে বিষয়ে পরামর্শ চাইলে। কিছুদিন পরে যখন খোঁজ নিলাম জানালে ওই দিনই তুমি তাঁর বাসায় গিয়ে উপহার বুঝিয়ে দিয়ে এসেছো। তোমার ওই বন্ধুটি নাটক আর বিজ্ঞাপনের এক পরিচিত মুখ। তোমার ভাষ্যমতে তাঁর তোমাকে প্রেমিক হিসেবে পাবার আকাঙ্খা আমাকে বিচলিত করেনি। দামী উপহারের সাগরে তাঁকে ভাসিয়ে রাখলেও হয়তো আমার তেমন কিছু যেত আসতো না কারন ওই সময়ে আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছিলাম। এরকম অনেক “আকর্ষণীয়” নারীরাই তোমার আশে-পাসে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতো। আমি একদমি তাঁদের মত ছিলাম না, কোনভাবেই না। মানুষ ভেদে বোধয় উপহারের ভিন্নতা দ্যাখা যায়। তাইতো যে তুমি বন্ধুদের পিছনে খোলা হাতে খরচ করবার গল্প দিতে, চেনা বন্ধুকে ল্যাপটপ, অচেনা নারী ভক্তদের দামি উপহার দিতে সেই তুমি আমার জন্য রাস্তা থেকে দোলন চাঁপার তোরা ৬০ টাকায় কিনবে কি কিনবেনা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেনা। তোমার কাঁধে ঝোলাবার একটা ব্যাগ ছিল। অনেক জিনিস পত্র ধরত ওতে। একদিন আমি জানতে চাই কোথা থেকে কিনেছো? বাণিজ্য মেলায় পাওয়া গেলে আমি একটা কিনবো। তুমি বলেছিলে “বাণিজ্য মেলায় এসব জিনিস পাওয়া যায়না, আমারটা পুরানো হয়ে গেলে তোমাকে দিয়ে দেব”। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি, কখনো কোন চাওয়া আমার অপূর্ণ থাকেনি। সম্পর্কের প্রথম দিকে তুমি আমার গাড়িতে ঘুরেছ, আমাদের বাসাতেও গিয়েছ, কন্যা হবার পরও আমার সৌখীনতাকে কতদূর উৎসাহিত করা হত বাসা থেকে তা তুমি জানতে। তবুও বোঝ নি কত যত্নে, ভালোবাসায় বড় হয়েছি আমি। তোমার কথা শুনে আমি আর এই বিষয়ে একটি বাক্যও ব্যায় করিনি। অনেক বড়লোক তুমি কিন্তু যে ছোটলোকী তুমি আমার সাথে করেছ, যে ছোটলোকী করে তুমি তোমার প্রতি আমার সন্মানবোধকে ছোট করেছ তাঁর তুলনা হয়না। তোমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব একেবারে প্রথম দিনেই খারিজ করে দিয়েছিলাম বলেই কি আমার জন্য এই আচরন উপযুক্ত মনে হয়েছিল তোমার? যার সাথে ভবিষ্যৎ নেই তাঁর পিছনে আবার বিনিয়োগ কিসের তাইনা?!

তোমার সাথে শারীরিক ভাবে অন্তরঙ্গ হবার প্রাথমিক দিনগুলোতে একদিন জানতে চেয়েছিলে আমি জিন্স পড়ি কিনা। তোমার বলার ভঙ্গী থেকে বুঝতে পেরেছিলাম ওটা তোমার খুব পছন্দের পোশাক। গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজে পড়া অন্তর্মুখী আমার তখনো মনে হয়নি কোন পুরুষকে ভালোলাগা দেবার জন্য নিজের স্বস্তির বাইরের কোন পোশাক পড়তে হবে। ক্যামন যেন বিদ্রুপের একটা হাসি হেসেছিলাম যেদিন বিয়ের পর তোমার পুরোদস্তুর সুশীল ধাচের বৌকে জিন্স-টি-শার্ট পরে কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে হাঁটতে দেখি। বিন্দু মাত্র অসন্মান করতে চাইছিনা আমি সেই নারীকে। আমি নিশ্চিত তোমাকে ভালোবাসেন বলেই তোমার পছন্দ-অপছন্দের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পেরেছেন তিনি। হাসি পেয়েছিল কেবল এটা ভেবে যে পুরুষের তুচ্ছতম আকাঙ্ক্ষা না মেটানো পর্যন্ত বোধয় নারীর মুক্তি নেই।

একদিন তোমার বাসায় গিয়েছি। খুবি ইচ্ছা করছিল ভক্তি বিনম্র মন নিয়ে তোমার কাঁধে মাথা রাখবো, কিছুক্ষন নীরবতার অদ্ভুত আশ্চর্য সুর শুনবো। তুমি তোমার কোলে বসার মিনিট খানেকের মধ্যে বোঝালে আমাকে শারীরিকভাবে পেতে চাইছো। আমি বল্লাম না। তুমি আমাকে নামিয়ে দিয়ে তোমাকে স্পর্শ করতে মানা করলে। স্পর্শে নাকি তোমার শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে! আমি তোমার পায়ের কাছে বসেছিলাম। তোমার ওই কথার অর্থ যে কি আমি আসলে তা বুঝিনি। আমি তোমার আশ্রয় পাবার জন্য এতটাই ব্যাকুল ছিলাম যে নীচে বসেই তোমার হাঁটুতে মাথা রাখলাম। তুমি প্রথমবার সরিয়ে দিলে। তখনো বুঝিনি ক্যানো, তাই আবারো মাথা রাখলাম। এবার তুমি এতটাই রূঢ়ভাবে সরিয়ে দিলে যে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এখনো ভাবি উনিশ,কুড়ির এক সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, ভালোবাসার জন্য ব্যাকুল তরুণীর এমন রূঢ় আচরনকি কোনভাবেই প্রাপ্য ছিল? তখনি আবার মনে পরে এটা তো সেই দেশ যেখানে নারী তো বটেই শিশু ও চুরান্ত নৃশংসতায় ধর্ষিত হয়। আমারতো আসলে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ যে “কামনার” বশবর্তী হয়ে তুমি আমাকে ধর্ষণ করোনি! সত্যি তুমি এবং তোমার মত পুরুষদের মহানুভবতার এত ঋণ আমরা নারীরা শুধবো কি করে?! চরম সৌভাগ্য আমার যে পুরুষের বিকৃত, আগ্রাসী যৌনতার উৎকটতম রূপটা অন্তত আমাকে দেখতে হয়নি তোমার সাথে। আর যদি দেখতে হত, যদি ধর্ষিত হতাম তাহলে সমাজতো প্রস্তুত ছিলই নষ্টা, দুশ্চরিত্রা, পতিতা বলে তোমার বিকৃত যৌনতাকে বৈধতা দিতে, আমি যে নিজে তোমার বাড়িতে গিয়েছি! আর কি প্রমান দরকার যে আমি খারাপ মেয়ে?!

প্রথম যেদিন আমার হাত ধরলে চমকে উঠেছিলে, জানতে চেয়েছিলে আমার হাত এত ঠাণ্ডা ক্যানো। আমাকে হাত মোজা কিনে দেবে কিনা জানতে চেয়েছিলে। হাসি চেপে আমি বলেছিলাম না। তুমি তখন বল্লে তুমি নাকি খুবি মা সুলভ, মায়ের মত যত্ন নাও। শরীরী অন্তরঙ্গতার একদিন জানতে চাইলে আমি এই ধরনের ব্রা পড়ি ক্যানো?! আমি আকাশ থেকে পড়েছিলাম! অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম ক্যানো কি হয়েছে তাতে?! তুমি বল্লে ওগুলোতে শেপ নষ্ট হয়ে যায় এবং আমার ফোমের ব্রা ব্যাবহার করা উচিৎ কারন ওতে স্তনের শেপ ঠিক থাকে। বলে আবারো জানতে চাইলে আমাকে আমার জন্য উপযুক্ত ব্রা কিনে দেবে নাকি?! এই বিকৃত সমাজে যেখানে নারীর শরীরী সৌন্দর্য তাঁর সামাজিক মর্যাদার নির্ণায়ক সেখানে কোন কোন মা তাঁর কন্যার স্তন, নিতম্বের আকৃতি নিয়ে চিন্তিত হলে হতেও পারেন। তুমি সেই বিকৃত পুঁজিবাদী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ, আর তাই উৎকটতম প্রতিনিধি আসলে তুমিই। আর তাই মা সুলভ মমতার নাম দিয়ে তুমি আমার শরীরের উপর নজরদারি করতে চেয়েছ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভণ্ডকেও তুমি, তোমার মত পুরুষেরা হার মানাবে। আর কি বা পারো তুমি? হৃদয় দিয়ে হৃদয় জয় করার যোগ্যতা তো তোমার স্পষ্টভাবেই ছিলনা, তাই অধিকার করতে চেয়েছ। অধিকার করতে চেয়েছ তাই যা তোমার হাতের নাগালে ছিল। মন পর্যন্ত যাবার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে সেই মানসিক উৎকর্ষতাইবা তোমার ছিল কোথায়? দুটো শরীর কাছাকাছি আসাটাই যদি নারী পুরুষের নৈকট্যের চরম লক্ষণ হবে তাহলে তোমাকে বন্ধু অন্তত বলতে পারতাম। দুঃখজনকভাবে তুমি আমার বন্ধুও হতে পারোনি। তুমি ধনী হতে পারো, সফল হতে পারো, বিখ্যাত কিংবা নারী-পুরুষের আকাঙ্ক্ষার পাত্র ও হতে পারো কিন্তু প্রেমিক তুমি কোনোভাবেই নও, ছিলেনা। না ছিল তোমার ভালোবাসবার যোগ্যতা, না ছিল ভালোবাসা সন্মানের সাথে গ্রহন করবার যোগ্যতা। তোমার গা দিয়ে সফলতা, খ্যাতি আর টাকার যে বোটকা গন্ধ বের হয় বিশ্বাস কর তাতে আমার বমি চলে আসে। অথচ শুনেছিলাম তোমার পারফিউম আসে সুদুর অ্যামেরিকা থেকে! হায়! তোমার জন্য করুনা ছাড়া কিছুই নেই আমার।

সর্বশেষ খবরে শুনেছিলাম তোমার নাকি দুটি কন্যা সন্তান হয়েছে। বিশ্বাস কর আর নাই কর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ওদের জন্য শুভ কামনা রইলো। কেবল প্রার্থনা করি তোমার কন্যাদ্বয়ের যেন তোমার মত প্রেমিক না জোটে।

Advertisements