আমার কথা জাত্যভিমানী পুরুষের মত যেন না শোনায়

সিমোন দ্য বুভোয়ার দ্বিতীয় লিঙ্গে একটা অধ্যায় রেখেছেন আত্নরতিবতী নারীর জন্য। তাঁর ভাষায় “… পরিকল্পিত কোনো কর্ম ও লক্ষের মাধ্যমে নিজেকে চরিতার্থ করতে না পেরে নারী বাধ্য হয় নিজের দেহের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজের বাস্তবতা খুঁজতে।” বুভোয়ারের এই বাক্যের সাথে আমি আমার বাস্তবতায় আংশিক একমত। নারী হিসেবে আমার নিজের জীবনের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা যখন আমাকে পুরুষতন্ত্র বিরোধী করে তখন আমি ভাবতে বাধ্য হই, সমাজ আমার শরীরী উপস্থিতির জন্য যে বাস্তবতা তৈরি রেখেছে তার কারনেই নারীবাদী হিসেবে আমি আমার আত্নপরিচয় নির্মাণ করেছি। বুভোয়ারের আত্নরতিবতী নারী জীবনের সহিংসতা, নিপীড়নের ব্যখ্যা খুঁজতে নিজের উপরে পরম গুরুত্ব আরোপ করেনা। আমি আমার অভিজ্ঞতার উপর গুরুত্ব আরোপ করছি নারীবাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের বাস্তব ভিত্তির সন্ধান করতে গিয়ে। পৃথিবীর তাবৎ নিপীড়িতের সাথে একাত্মতার উৎস খুঁজতে গিয়ে যখন আমি আমার ব্যক্তিগত নিপীড়নের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে চাই তখন তাঁর মধ্যে আত্নরতি কিছুমাত্রায় হয়তো থাকে। কিন্তু সচেতনায়নের প্রক্রিয়া হিসেবে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজের অভিজ্ঞতার পুনরপাঠ আমার গ্রহণীয় একটি পথ মনে হয়। নারী, পুরুষ, উভলিঙ্গ সকলের জন্যই। বারবারা এহরেনরেইখ এর মত আমি বিশ্বাস করি নারীবাদী বিশ্লেষণের মাধ্যমে নগ্ন করে ফেলা বাস্তবতা বোঝার অর্থ হচ্ছে কাজে নেমে পরা, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গী আছে কিন্তু দর্শক হিসেবে আছেন এমন হবার কোন সুযোগই নেই। তাই নারীর ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা যখন সচেতনায়নের, সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ তখন তা আমার কাছে বরণীয়। সিমোন আত্ন রতিবতী নারীর জন্য একটি অধ্যায় নিবেদন করেছেন। তিনি পুরুষের অহিংস জাত্যভিমান, আত্নপ্রেম নিয়ে লিখলে আমরা আরও উপকৃত হতাম। পুরুষের এই জাত্যভিমান সহিংসতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়। সেটা ব্যাটাগিরি, পৌরুষের একটা নমুনা। কিন্তু তাত্ত্বিক পুরুষের জাত্যভিমান প্রকাশিত হয় নারীর অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞান খারিজ করার মধ্যে দিয়ে। এটা শরীরী সহিংসতা নয় কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে নারীকে জ্ঞানের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে এই পুরুষালী জাত্যভিমান। নিজের অভিজ্ঞতা লিখবার শুরুতে তাই আতঙ্কিত বোধ করছি। মনে প্রানে কামনা করি যেন আমার কথা আত্নপ্রেমে গদ গদ ঐ পুরুষদের মত না শোনায় যারা ব্যক্তি নারীর পুরুষতন্ত্র বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকাবার পদ্ধতিকে খারিজ করেন ব্যক্তিগত, অতিবিপ্লবী বা ঐ জাতের কোন তকমা দিয়ে। তাঁদের কাছে এটা সেচেতনায়নের প্রক্রিয়া না, তাঁদের কাছে এটা নারীর আত্নরতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পাবলিক বাসে চড়ার অভ্যাস করেছিলাম। নিজের ভেতরের ভয়, অস্বস্তি কাটাতে চাওয়া এর একটা প্রধান কারন ছিল। আমি খুব সচেতনভাবে যৌন হয়রানী, নারী বিদ্বেষী আচরণগুলো মোকাবেলা করার চেষ্টা করতাম। একদিন সন্ধ্যার ঘটনা; ওটা মনেহয় শেষ বাস ছিল। পুরো বাসে তিল ধারনের জায়গা ছিলনা। দেখি নারী সিটে এক “ভদ্রলোক”, দেখে মনে হয় সচ্ছল, নির্বিকার, ঔদ্ধত্বের ভঙ্গীতে বসে আছেন। তাঁর পাশে কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে। আমি তাকে বল্লাম নারীদের বসার জায়গা দিতে। তাঁর ক্ষুব্ধ, রাগান্বিত, ঔদ্ধত্ত্বপূর্ণ ভঙ্গী আজো আমার চোখে ভাসে। তিনি তর্কা তর্কীর একপর্যায়ে এমনভাবে আমাকে শাসাতে শুরু করেন যেন মনে হোল দখলদারি তিনি না আমি করেছি। তখন না বুঝলেও আজ বুঝি আশে পাশের কোন নারীই আমাকে সরব সমর্থন কেন দেননি। কে আর তাঁর নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়াতে চায়? বাক যুদ্ধে ইতি টেনেছি আমি। পুরুষতন্ত্র তো কবেই জিতেছে। শেষ মেশ এক অল্পবয়স্ক মেয়ে বলে ওঠে “আপু এরা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।” ঐদিন তর্ক করতে করতে এত আতঙ্কিত বোধ করছিলাম যে মনে হচ্ছিল আমার সাথে ঐ ভদ্রলোক “কিছু করলে” ঐ বদ্ধ বাসের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পরতে পারবো অন্তত। রিকশায় চড়তে গিয়ে এরকম দুইবার হয়েছে। অন্যমনস্ক ভাবে যাচ্ছি, হঠাৎ গায়ের উপর থক থকে থুতুর ছিটকে পড়ায় চমকে উঠেছি! তীব্র অপমান আর ঘৃণায় কুঁকড়ে গেছে শরীর মন। যেন পুরুষের ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আমি নিজের শরীরকেই ঘৃণা করতে শিখছি। পুরুষতন্ত্রে এটাইতো নারীর স্কুলিং। নিজের শরীর আর অস্তিত্বের ভার নিয়ে সর্বদা বিব্রত, লজ্জিত হয়ে উঠবার প্রথম পাঠ। ঐদিনের ঐ থকতকে থুতু আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে পাবলিক পরিসরে, পুরুষের দুনিয়ায় আমি অবাঞ্ছিত, অসহায়, অধস্তন। বাড়িতে এসে হাউমাউ করে কেঁদেছি কিন্তু অপমানের জ্বালা মেটেনি আজো।

পাবলিক পরিসরে যত ধরনের নারী বিদ্বেষী আচরন, যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছি তা লিখতে গেলে আরো বহু পাতাই খরচ হবে। যেসকল “তাত্ত্বিক” আমার নারীবাদ খারিজ করে দেন কোনদিন অর্থকষ্টে না থাকার দোষে, পাবলিক বাসে না চড়ার দোষে তাঁদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয় তারাকি কখনো যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন? ধর্ষণের আতঙ্কে দিন পার করেছেন? প্রতিমুহূর্তে নিজের গতিবিধি, শরীরের উপর নজরদারী করেছেন? আপনার সার্বক্ষণিক সতর্কতা কি কখনো হিস্টিরিয়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে নিজেকে প্রায় উন্মাদ মনে হয়েছে? যদি আপনাদের এমন হয়েও থাকে বা নাও হয়ে থাকে তবুও কারো কোন অধিকার নেই বাপের গারীতে চড়ার দোষে আমার নারীবাদ খারিজ করার। মানলাম বিত্তশালী নারী আমি। যারা নারীবাদ বলতে কেবল শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত নারীর অধিকার বোঝে তাঁরা না বোঝে পুরুষতন্ত্র না বোঝে নারীবাদ। তাঁদের নারীবাদ কোন শক্তিতে পৃথিবীর তাবৎ নারীকে(নির্যাতিতকে) একত্রিত করবে যদি শেষপর্যন্ত তাঁদের শ্রেণী ঘৃণার টার্গেট হয় একজন নারীই, (যে নির্যাতিত)? নারী ঘৃণা যে শ্রেণী ঘৃণার নামেও বৈধ হয় সেটা বোঝার মত সচেতন কি তাঁরা হতে পেরেছে? বুভোয়ার, নারীবাদী সাংবাদিক অ্যালিসের সাথে আলাপ কালে বলেছিলেন “…নারী একটি ‘নিচু জাত’, ‘জাত’ বলতে এমন একটি গোষ্ঠী বোঝায় যেখানে কেউ জন্মালে আর ঐ গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসা যায়না।… অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক জীবনে মেয়েরা এমন সব আচরন পেয়ে থাকে, যা তাঁদের সত্যি ‘নিচু জাতে’ পরিনত করে।” প্রেক্ষাপট ভেদে নিপীড়নের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও সমাজ সৃষ্ট ‘নিচু জাত’ হিসেবে কিছু সাধারন অভিজ্ঞতা নারীর আছে। পদ্ধতিগতভাবে ধর্ষণকে নারীর বিরুদ্ধে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নারীর অভিজ্ঞতার চোখ দিয়ে ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যাবে নারী ধর্ষণের সবচাইতে অসহায় শিকার ছিল, এখনো আছে। বড়লোকের মেয়ে বলে কিন্তু ধর্ষণ, যৌন হয়রানীর আতঙ্ক থেকে আমি মুক্তি পাইনি। আমার বাপের গাড়ীর চালকও কিন্তু পুরুষ। এবং আমি বিশ্বাস করি সকল পুরুষই সুপ্ত ধর্ষক। অনেকে বলে বুর্জোয়া নারী পুরুষ রিকশাওয়ালাকে চড় মারতে পারে কিন্তু গরীব রিকশাওয়ালা সেটা পারেনা। সেই বুর্জোয়া নারীকে বুকে হাত দিয়ে বলতে বলেন সে রিকশাওয়ালার কাছ থেকে যৌন হয়রানী, ধর্ষণের আশঙ্কা করেনা কিংবা এমন হয়না।

নারী ঘৃণা আজকাল নারীবাদীদের ঘৃণা পর্যন্ত প্রসারিত। এক একবার মনে হয় বাংলাদেশ ভূত দেখে, নারীবাদের ভূত। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় র‍্যাডিকাল নারীবাদের ভূত। কিযে বিপদ নারীবাদীদের! যৌন হয়রানী, যৌন সহিংসা, ধর্ষণ নিয়ে কথা বললেই রটনা করা হয় ও র‍্যাডিকাল নারীবাদী, ও একপেশে কেবল যৌনতা দিয়ে সুবকিছু বুঝতে চায়! নারী প্রশ্নে, তাঁর শরীরের নিয়ন্ত্রনের প্রশ্নে আজো শিক্ষিত বাঙ্গালীর মনে কত ধরনের কুসংস্কার বিরাজ করে তাঁর প্রমান পাওয়া যায় এই ধারনায়। যৌন হয়রানী আর যৌনতা কি এক?! ধর্ষণ আর সঙ্গম কি এক?! সহিংসতা, অপমান আর প্রেম, ভালোবাসা কি এক?! যৌন হয়রানী, ধর্ষণের আলোচনায় যৌনতার সামাজিক নির্মাণ অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। এই নির্মাণের পাঠ বাদ দিয়ে আমার মতে যৌন সহিংসতার পাঠ সম্পূর্ণ হতে পারেনা। বিশেষভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমি মনে করি যৌনতার পাঠ, স্কুল কলেজে কোন দিন যদি যৌন শিক্ষা চালু করা হয় তা যৌন সহিংসতার ধারনার সাথে সম্পর্কিত ভাবেই হতে হবে। যে দেশে ‘নারীর হিতার্থে’ নিয়োজিত এনজিও গোষ্ঠী একটা মাত্র শারীর বিনিময়ে নারীকে সারাজীবনের নামে বন্ধ্যা করে দেয়, জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি গ্রহনের দোষে মৌলবাদীরা ফতোয়া দিয়ে একঘরে করে নারীদের, সেই দেশে নারীর আত্ন নিয়ন্ত্রনের প্রশ্নকে আরও বহুকাল বহু অন্ধকার মোকাবেলা করেই এগুতে হবে। নারীর শরীরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রনের প্রশ্ন বাদই দিলাম। যৌন সহিংসতার সুবিচার পাবার জন্যই অনেক কাল রাজনৈতিকভাবে লড়তে হবে।

বেগম রোকেয়ার মতে নারীকে নিয়ন্ত্রনে রাখতেই পুরুষতন্ত্র ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বর প্রেরিত আদেশপত্র বলে দাবি করেছে। তাঁর সময়ের অবরোধবাসিনীর ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন সহিংসতার কথা তাঁর লেখায় একরকম নেই অথচ সে সময়ে কন্যা শিশুর বিয়ের দিব্যি চল ছিল। উপনিবেশিকরনের কথা তাঁর লেখায় এসেছে। অনেকসময় রূপক গল্পে। আজকের দিনে নারী যেখানে বিপুল মাত্রায় পাবলিক পরিসরে জড়িয়ে পরেছে তাঁর যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন তাই আর রোকেয়ার লেখায় দেখা যায়না। কিন্তু অবরোধবাসিনীর যৌন নির্যাতনের কথাও তাঁর লেখায় একরকম অনুপস্থিত। সেই হিসেবে তসলিমা আজকের দিনের নারীর জীবনের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছেন অনেকখানি। রোকেয়া সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে লিখেছেন, নারীর শিক্ষার মত কিছু দিক সর্বাধিক গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন। এইসকল দিক সহ তাই মুসলিম প্রধান দেশ বলে রোকেয়ার পর্দানশীল ভাবমূর্তির গ্রহণযোগ্যতা হয়তো অনেকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যাবহার করতে চান। অপরপক্ষে তসলিমাকে নিয়ে নানান বিতর্ক থাকার অর্থ এইনা তসলিমার নারীবাদী চিন্তা পুরোপুরি ভুল, অগ্রহণযোগ্য। আমি মনে করি কোন বিশেষ এক বর্গের নারীবাদ, কোন এক বিশেষ সমস্যা সমাধানে নিবেদিত নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আজকের বাংলার নারীর সকল সমস্যা চিহ্নিত হবেনা, সমাধানও হবেনা। পহেলা বৈশাখ, ফেব্রুয়ারীর বই মেলা, খেলায় জেতা বিজয় মিছিলে নারী যেমন যৌন হয়রানী, ধর্ষণের শিকার হয় তেমনি এটাও সত্য ঢাকা শহরে নারীর জন্য আলাদা বাস, পাবলিক টয়লেট, কর্মজীবী নারীর শিশুর পরিচর্যা কেন্দ্রও নেই।

নারীর বাস্তব জীবনের যৌন হয়রানীর অভিজ্ঞতা সহজ ভাষায় লিখলে তসলিমা সাহিত্যিক পদবাচ্যেরই কেউ হন না। অথচ যৌনতার ইতিহাস লিখে ফুকো আমাদের কাছে বড় তাত্ত্বিক। ব্রাউনমিলার ধর্ষণ নিয়ে লিখে আমাদের কাছে হন র‍্যাডিকাল নারীবাদীর মত ঘৃণ্য বর্গ অথচ পুরুষ ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে হাজিরা দিয়েই হতে পারেন নারীবান্ধব হিরো। শরীরে, মনে জড়সড়, আতঙ্কিত করে রাখার ব্যবস্থা এই সমাজ সকল বর্গের নারীর জন্য করেছে এই বিষয়ে আমি সচেতন। আর পুরুষের জাত্যভিমান সচেতন আমার বিয়ে করা না করা, সমকামী হওয়া না হওয়া, বড়লোকের মেয়ে, বউ হওয়া না হওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে, নানান অজুহাতে আমার নারীবাদকে খারিজ করতে। আমরা সবাই একটু ভালো করে তাকাই। ঐ এসি গাড়ীর কাঁচ ভেদ করে কারো বউ না, মেয়ে না মানুষ দেখতে পাবো। আরও ভালো করে তাকালে হিন্দি সিরিয়াল, পাকিস্তানী লন, ব্যাংস কাট আর হট পিংক লিপস্টিকের পেছনে একটা মনও দেখতে পাব। সেখানে আশঙ্কা আছে, অপমান আছে, বিচ্ছিন্নতার কষ্ট আছে, ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে চলার ক্লান্তি আছে, দীর্ঘশ্বাস আছে। এটা যারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেনা তাঁদের জন্য করুনা ছাড়া কিছু নাই আমার। কামনা করি সকল বর্গের নারীবাদ পুরুষতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে শরিক হোক। আমি বিশ্বাস করতে চাই সেটাই সুলতানার স্বপ্নের মূলমন্ত্র ছিল।

Advertisements

ভাষা কি আমার অভিজ্ঞতার ধারক?

উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিষয়ে আমার একাডেমিক ট্রেনিং আছে। নিও লিবারাল অর্থনীতির যুগে সমাজ বিজ্ঞান সহ অন্যন্য সকল বিভাগের মত এই বিভাগটিও এনজিও মুখী পড়াশোনা দিয়ে খুব বেশি মাত্রায় প্রভাবিত ছিল। নিজের পড়ার আগ্রহের কারনে অথবা অন্য যে কারনেই হোক ততোদিনে আমার বিভাগ নিয়ে মোহভঙ্গ হয়েছে। বিভাগের বাইরে এসে যখন প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহলে পাঠচক্র, আলোচনার সাথে পরিচিত হলাম তখন নারী বিষয়ে কতগুলো নতুন শব্দবন্ধের সাথে পরিচিত হয়েছি যা আমার একাডেমী আমাকে শেখায়নি। যেমন নারী ইস্যুতে আলোচনা করতে গেলে “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা প্রায়ই ব্যাবহার হতে শুনেছি।

প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও এই টার্ম/শব্দবন্ধের কিছু সুবিধাজনক দিক আছে আবার কিছু অসুবিধার দিকও আছে। সুবিধা হোল এটা নারী পুরুষকে একসাথে সম্বোধন করে। কেবলমাত্র নারীকে নিয়ে অনেক বেশি আলো ফেলে পুরুষের করনীয়কে অদৃশ্য করে দেয়না যেটা বিভাগের পড়াশোনায় প্রায়ই দেখেছি। কেউ যেন এটা না বোঝে যে আমি মনে করছি নারী অবস্থা নিয়ে আলোচনা কম হওয়া উচিত। আমার বরং মনে হয় নারী ইস্যুতে যথেষ্ট গুরুত্ব ও প্রাধান্য নিয়ে আলোচনা হয়ইনা একরকম। আমার মতে “জেন্ডার” ধারনাটা আলোচনায় না এনেই “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা একই সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নারী পুরুষ সম্পর্কে উপযুক্ত আচরনবিধি কি হতে পারে সেই সম্ভাবনার দিকে আলো ফেলে। এই শব্দ বন্ধের সবচাইতে সফল দিক আমি মনে করি এটাই।

যখন এটা নারী জীবনের সমস্ত দিকের বা ইস্যুর প্রতিস্থাপক হয় তখন “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা শুনলে আমার গায়ে জ্বালা ধরে যায়। পুরুষের সাথে সম্পর্কের বাইরে নারী নাই নাকি?!! আজ যদি আমি সমকামী হই বা যদি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শের কারনে পুরুষের সাথে যৌন সংসর্গ থেকে শুরু করে সমস্ত সম্পর্ক বর্জন করি আমার কথা কি তাহলে এই টার্মটা বলতে পারবে?! আমি গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজে পড়েছি, আমি নিশ্চিত চাইলে এমন এমন প্রতিষ্ঠানে আমি সারাজীবন পার করতে পারি যেখানে কোন পুরুষ নাই। তাতে আমি কি বৃহত্তর যে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আছে তাঁর নিপীড়নের বাইরে থাকবো? তাহলে পৃথকীকরণ ব্যবস্থায় থাকা নারীরা সবচাইতে নিপীড়ন মুক্ত থাকতো বলা যায়। আমি মনে করি এনজিও প্রকল্পের বাইরে সমকামিতা, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বজনের আলোচনা খুব কম হয়েছে। সেটার সাথেই তাল মিলিয়ে নারীর জীবনের এই প্রশ্নগুলো আজো অনুচ্চারিত আছে।

কেবল নারীর সাথে সম্পর্কে থেকেও নারী ও আরো অনেকেই পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই যদি হয় তাহলে নারী জীবনের সমস্ত প্রশ্নকে “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” টার্ম দিয়ে রিপ্লেস করা অর্থহীন। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতেও “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা কিছুটা অনুপযোগী। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর সম্মতিতেও বৈধ হয়। যে পুরুষ পাবলিক প্লেসে অচেনা (তাঁর সাথে সম্পর্কে না থাকা) নারীকে যৌন হয়রানী করে সে তাঁর বউয়ের কাছে আদর্শ পুরুষ হতে পারে। বউয়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক মধুর হতে পারে। তাহলে তাঁর এই নারী বিদ্বেষী আচরন কি “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা ব্যাখ্যা করতে পারে?

ফুকোর একটা কথা আছে “Self is the sight of multiple practices”  সহজ বাংলায় বলতে গেলে এটা বোঝায় মানুষ নিজে বহুবিধ চর্চার একটা ক্ষেত্র। এর সহজ একটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে পুরুষের ক্ষেত্রে। যে পুরুষ পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানী করে, সেই পুরুষ হয়তো তাঁর কন্যা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। তাঁর প্রতি অসন্মানের দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও কিছু সুবিধা তাঁর স্ত্রী, কন্যাকে দিচ্ছে, এমনভাবে যাতে পুরুষ হিসেবে তাঁর প্রভু অবস্থার কোন সংকটে পড়ছেনা। “নারী পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা ঐ পুরুষের পাবলিক প্লেসে হয়রানী করার কথাটা উল্লেখ করতে পারেনা। এই টার্ম ঐ পরুষের নিপীড়নকারী স্বভাবকে নতুনভাবে চিহ্নিত করার জন্য শুন্যতা তৈরি করে, সাথে সাথে সম্পর্কে থাকা নারীদের প্রতি নুন্যতম মানবিক আচরন চিহ্নিত করায় তাকে হয়তো আরও সচেতন করে তোলা যায় সেই পথ দেখায়।

কোন কিংবদন্তী দার্শনিক পুরুষের নারী বিষয়ক অবস্থান বুঝতেও টার্মটা যথেষ্ট না। এটা নারীবাদের, নারীর, পুরুষের জীবনের একটা অংশ হতে পারে মাত্র, একটা কিন্তু কম জরুরী না মোটেও। নারীর সাথে সম্পর্কে না থেকেও পুরুষের, নারীর বা যে কারো নারী সম্পর্কে ভাবনা থাকতে পারে। যেটাতে ধর্ম, সংস্কৃতি, বিদ্যমান সমাজের আদর্শ প্রতিফলিত হতে পারে। সেই যে কেউ পুরুষতান্ত্রিক কিনা তা বুঝতে এই টার্মটা আমার একেবারেই যথেষ্ট মনে হয়না। এটা খুবি জরুরী কিন্তু একটা দিকে আলো ফেলে মাত্র।

কোন প্রতিষ্ঠানের নারী-পুরুষের কোড অফ কন্ডাক্ট বা উপযুক্ত আচরণবিধি কেমন হবে সেই বিষয়ে বলতে এই টার্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি বা তাঁর আদর্শ অবস্থান বোঝাতে “নারীপুরুষ সম্পর্ক” কথাটা যথেষ্ট না। কেউ নারী বান্ধব কিনা, নারী বিদ্বেষী কিনা তা এই টার্মটা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

আর একটা শব্দ যেটা প্রায়ই আলোচনায় শুনি সেটা হোল “ব্যাটাগিরি”। অনুমান করি “ম্যাস্কুলিনিটি” শব্দের চলতি বাংলা এটা। শব্দটা আমার খুবি পছন্দের কারন এর সহজবোধ্যতা। আমি “ম্যাস্কুলিনিটি” বিষয়ক একটা গবেষণার অনুবাদের অংশ ছিলাম। তখন এই শব্দের বাংলা করেছিলাম “পৌরুষ”। ভদ্রলোকী বাংলা এটা কোন সন্দেহ নাই। এটার চাইতে বরং “ব্যাটাগিরি” শব্দটা মানুষের সাথে অনেক বেশি যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু এই শব্দের সমস্যা হোল এটা সহিংস, আগ্রাসী, মাতব্বর সুলভ কিছু পুরুষালী বৈশিষ্ট্য বোঝায়। তারমানে সহিংস, আগ্রাসী আলগা কিছু পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের পুরুষের আদলটাই এটা সামনে আনে। নরম, কোমল, ব্যর্থ, অসফল পুরুষগুলোকে নয়।

আমার বিভাগের এক শিক্ষক একবার বলেছিলেন বিভাগ এক্টিভিজম জায়গা না। তাঁরা হয়তো মনে করেন এক্টিভিজমের জন্য এনজিও আছে! এযাবৎ পর্যন্ত মানব সভ্যতায় নারী অধিকার সহ যা কিছু অর্জন হয়েছে তাঁরা হয়তো মনে করেন সেটা এনজিওর দান! তাই এক্টিভিজম এনজিওর হাতে ছেড়ে দিয়ে বিভাগে জনবিচ্ছিন্ন, “বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা” করতে করতে চান তাঁরা। নারীবাদতো আসলে “উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ” নামে দুনিয়াব্যাপী যত বিভাগ আছে তাঁদের আবিষ্কার! তাঁদের উচিত শব্দগুলো প্যাটেন্ট করে রাখা! একাডেমীক জ্ঞান আসলে কতটা জন বিচ্ছিন্ন হতে পারে তাঁর প্রমান এটা।

শব্দের জন্ম, টার্ম নিয়ে কাড়াকাড়ি দেখে কিছু বিষয় উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে হয়। নারী বান্ধব, নারীবাদী একটা শব্দের উচ্চারন, উল্লেখ আসলে একটা জরুরী বিষয়। শব্দ কেবল ভাষাকে নির্দেশ করেনা, এটা অভিজ্ঞতার বাহক। স্মৃতি তথা ইতিহাসের ধারক। পতিতা, সতী ইত্যাদি শব্দের পুরুষবাচক শব্দ না থাকা যেমন নির্দেশ করে নারী পরুষের পৃথিবীতে বাঁচে তেমনি যৌন হয়রানী, বিবাহ উত্তর ধর্ষণ নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতাকে মূর্ত করে। এগুলো জনমনে, জ্ঞানের জগতে ইতিহাসসৃষ্ট সত্ত্বা হিসেবে নারীর অভিজ্ঞতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তাই নারীর অথবা যে কারো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শব্দ যেমন কোন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হতে পারেনা, তেমনি হতে পারেনা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এক্টিভিজম, আর জ্ঞানচর্চা পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা হতে পারেনা। নারীর নিপীড়নের বাস্তব অভিজ্ঞতায় যেমন একাডেমী/বিভাগের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ হতে হবে তেমনি বিভাগের জ্ঞানকে উৎসাহিত করতে  হবে সমাজ পরিবর্তনের দরকারি কাজগুলো করতে। পারস্পারিক আদান প্রদান ছাড়া জ্ঞান জনবিচ্ছিন্ন, স্থবির একটা বিষয়ে পরিনত হতে বাধ্য।

আত্নপরিচয়ের সংকট আর গ্ল্যামারাস সমঅধিকার

ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের ভালো চাকরি পাবার চেষ্টা দেখা একটা বেদনাদায়ক বিষয়। এরা ক্ষমতার সামনে যে আচরন করে তা থেকে মধ্যবিত্তের নৈতিক অধপতন টের পাওয়া যায়। ভালো চাকরি পাওয়ার আশায়, সফল, চকচকে জীবন পাওয়ার আশায় তারা ক্ষমতার সামনে যেভাবে মাথা নত করে তা ভাবলে আজো আমার গায়ে কাঁটা দেয়। গা গোলাতে থাকে, রীতিমত বমী পায় ভাবলে যে এর অর্থ স্রেফ সমস্ত সৃজনশীলতা বর্জন করে কেরানীর মত হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলানো। তাঁর(অধিকাংশ সময় পুরুষ শিক্ষকের) কথায় কথায় নানান জাতের অপমানকে রসিকতা হিসেবে, স্নেহ হিসেবে নিয়ে মুগ্ধতার ভান করা। এর চর্চা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। সবচাইতে বেশি যে শিক্ষক এনজিওর প্রোজেক্টে কাজ করেন তাঁর আশে পাশেই পাওয়া যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের “বিরল প্রতিভাদের”। শুনতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের মাস্টারের বাড়ির বাজার করলে, ফাই ফরমাশ খাটলেই নাকি শিক্ষক হওয়া যেত! ছাত্ররা হয়তো এতটুকু করেই পার পেতেন, অনুমান করি ছাত্রীদের আরও অনেক কিছুর ঝুঁকি ছিল। রাজি না হলে, অন্তত দাস সুলভ আনুগত্য না দেখালে ছাত্রীর চরিত্র হনন। আমি নিজেওতো এর শিকার। বিশ্বাস হয়না এরা দেশের সর্বচ্চো ডিগ্রিধারী, সর্বচ্চো নম্বর পাওয়া ছাত্র, ছাত্রী। আশ্চর্য লাগে ভাবলে এমন মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব করার আগে তারা নিজেদের কাছেওকি একবার লজ্জিত বোধ করেনা?! এতো কেবল আচরণগত দিক! আমার বিভাগের সিলেবাসে এনজিওর প্রকল্পের এত জাতের বিবরনের হেতু আমি কোনভাবেই খুঁজে পেতাম্না! উন্নয়ন বিষয়ে বিভাগ, পড়াশোনা আপেক্ষিকভাবে নতুন, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে কিন্তু তাতো মৌলিক বইগুলো থেকে কোনভাবেই বেশি জরুরী হতে পারেনা। নারীবাদের মৌলিক বইগুলোর সাথে আদর্শিক বৈপরীত্যের সাথে সাথে এনজিওর ভাষার যে পার্থক্য তাতে অবাক না হয়ে পারতামনা। আশ্চর্য হয়ে দেখতাম নারীবাদের ক্ষুরধার, স্বচ্ছ রাজনৈতিক বক্তব্যের সামনে এনজিওর, প্রোজেক্টের ভাষা কি পরিমান নির্বিষ আর ভোঁতা!

আমার সময়ের সবচাইতে জরুরী লেখক অরুন্ধতীর কথা না বলে পারিনা। ২০০০ সালের মার্চে তিনি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরামে আলোচক হিসেবে হেগে যান। সাড়ে তিন হাজার প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক, ব্যাবসায়ী, মন্ত্রী, ব্যাংকার পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হন। প্রত্যেক বক্তৃতা সেখানে শুরু হয় “নারীর ক্ষমতায়ন”, “জনগণের অংশগ্রহন” শব্দবন্ধ দিয়ে অথচ তারা যা করতে চাইছে তা হোল বিশ্বের পানির প্রাইভেটাইজেশন! কে না জানে এতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ নারীরা যাকে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়। অরুন্ধতীর মতে তাই ঐ ফোরামের অভিজ্ঞতা ছিল একজন লেখকের দুঃস্বপ্নের মত। একজন লেখক যেখানে সারাজীবন পার করেন ভাষা এবং চিন্তার মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে সেখানে ঐ ফোরামে চেষ্টাই যেন ছিল নিজেদের অসৎ, অন্যায্যভাবে মুনাফা কামানোর উদ্দেশ্যকে ভাষার মুখোশ পরানো! এনজিওর প্রোজেক্টের ভাষার এই ফাঁদ, চাতুর্য অরুন্ধতীর ঐ লেখায় আমার কাছে সবচাইতে ভালোভাবে স্পষ্ট হয়। মারিয়া মাইস তাঁর “সার্চ ফর এ নিউ ভিশন” বইতে প্রায় একই কথাই বলেছেন। তাঁর সময়ের নারী আন্দোলনের কর্মীরা আবিষ্কার করে যে তাঁদের নারী আন্দোলনের ইতিহাস কিভাবে পদ্ধতিগতভাবে একাডেমীর পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তারা এই সত্যও উপলব্ধি করেছে যে তাঁদের পূর্বের নারী আন্দোলনের কর্মীদের দাবি দাওয়া তাঁদের তুলনায় ছিল বহুলাংশে র‍্যাডিকাল।

আজকের দিনে ফেয়ার এন্ড লাভলি আমাকে সমান অধিকারের জ্ঞান দেয়। নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ যখন ঘোষণা দেয়া হয় তখন সমান অধিকার ইসলাম পরিপন্থী বলে যারা মাঠ গরম করছিলেন জানতে ইচ্ছা করে আজ তারা কোথায়? নাকি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা আর অর্থের সামনে তাঁদের ইমানি জোশ ঝিমিয়ে পরে?!

একদিকে ধর্মান্ধদের চোখ রাঙ্গানি, অন্যদিকে ফান্ডের টাকায় “নারী আন্দোলনের” গতি প্রকৃতি নির্ণয়। আরও আছে অধিকারের নামে রাষ্ট্রের ভাঁওতাবাজি। এতসবের মাঝে সাধারন শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত পেশাজীবী নারীর যে নিত্যদিনের সংগ্রাম তা দিশা হারাতে থাকে। পৃথিবীর তাবৎ বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মানুষের বিদ্রোহের ভাষা যেভাবে ছিনতাই হয় নারীর বিদ্রোহের ভাষা, ধিক্কারের ঝাঁঝ তেমনিভাবে ছিনতাই হয় প্রতিদিন। খণ্ডিত, লাঞ্ছিত হয়ে ঠাই নেয় প্রোজেক্ট পেপারে। এ আর অবাক কি প্রোজেক্টের উচ্ছিষ্টভোগীরাই বলবে “ফান্ড ছাড়া বাংলাদেশে কোন নারী আন্দোলন হবেনা”!

আন্তর্জাতিক নারী বর্ষও তাঁর দ্রোহের আগুনে পোড়া ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের সফল সম্মেলন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ঘোষণা দেন ক্লারা জেটকিন। আজকের অফিসিয়াল দলিলে ক্লারা জেটকিনকে যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর তেমনি দুষ্কর সমাজতন্ত্রী শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নারী দিবসকে খুঁজে পাওয়া।

নারীবাদের বাইবেল “দ্বিতীয় লিঙ্গের” লেখক সিমোন দ্য বুভোয়ারের নারী দিবস নিয়ে সন্দেহ যায়না। তিনি এটাকে শ্রমজীবী নারীর সংগ্রামের অর্জন হিসেবেই জানেন। তাঁদের সংগ্রামের ইতিহাস থেকে ছিনতাই হয়ে তাই ৮মার্চ যখন কেবল জাতিসংঘের ঘোষিত দিবসে পরিনত হয় তখন তিনি সাবধানবানী উচ্চারন করেন। নারী আন্দোলনকে কব্জা করার জন্যই, ঝড়কে শান্ত করার জন্যই আজকের এই নারী দিবস।

মধ্যবিত্তের মানস কাঠামোয় ফেয়ার এন্ড লাভলির সমঅধিকারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাঁদের কাছে নারীর সমঅধিকার মানে মধ্যবিত্ত, অভিজাত নারীর পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে গ্লসি, চকচকে জীবনের অধিকার। গালভরা নামের, বড় বড় আন্তর্জাতিক এনজিওর নানান প্রোজেক্টের বাক বাকুম! সমাজ, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন এই গ্লসি সমঅধিকারের ডামাডোলে শ্রমজীবী নারী, বৃত্তের বাইরে এসে আত্নপরিচয় সন্ধানী মধ্যবিত্ত নারীর কণ্ঠস্বর চাপা পড়তে থাকে প্রতিনিয়ত। বাবা, মার সাথে টিভি দেখতে বসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির গ্ল্যামারাস সমঅধিকারের প্রচারনা দেখে আমি লজ্জিত হই। ভাবি আত্নপরিচয়ের সংকটে থাকা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঐ গালভরা নামগুলো জপতে না পারলে নারীর অধিকারও বোঝে না, তাঁর নিত্যদিনের সংগ্রামও বোঝেনা। নারীর অধিকার ছেলের হাতের মোয়া না, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ছাড়া একে অর্জন করা যায়নি কখনো যাবেওনা।

এই আমি ছোটবেলায় আঁকিয়ে হতে চেয়েছি। সেই ইচ্ছা হত্যা করা হয়েছে ইসলামের নামে। বিজ্ঞান না মানবিক শাখায় পড়তে চেয়েছি, সেই ইচ্ছা হত্যা হয়েছে সফল জীবনের নামে। আজ শ্রমজীবী, নিগৃহীত মধ্যবিত্ত নারীর স্বার্থের পক্ষে থাকতে চাই সেই সম্ভাবনা হত্যার পায়তারা চলছে ফেয়ার এন্ড লাভলির গ্ল্যামারাস সমঅধিকার, আর গালভরা নামের এনজিওর চকচকে চাকরির নামে। তবুও আমি সমঅধিকারের ন্যায্যতায় দৃড় বিশ্বাসী, তাই অরুন্ধতীর কথা দিয়েই শেষ করি “আমার বিশ্বাস এই মানচিত্রের প্রতিটি নাগরিকই সাম্রাজ্যবাদের ভোক্তা নয়। কম হোক বেশি হোক তাঁদের কেউ কেউ অন্যদের নিয়ে ভাবে………আসল সত্য বুঝতে হলে এই বৃত্তের বাইরে এসে অন্যদের কথা, অন্য গল্প শুনতে হবে।”

তথ্যসূত্রঃ

১) দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে, সিমোন দ্য বুভোয়ার ও অ্যালিস শোয়া্রজার-এর আলাপচারিতা, আলম খোরশেদ সম্পাদিত

২) সার্চ ফর এ নিউ ভিশন, মারিয়া মাইস

৩) দি অ্যালজেব্রা অফ ইনফিনিট জাস্টিস, অরুন্ধতী রায়

৪) মুক্তস্বর, বিপ্লবী নারী সংহতি

৫) দানবের রূপরেখা, অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকার, হাসান মোরশেদ

তোমাদের এই শহরে

IMG_6044 IMG_6048                             অজুতে নিজুতে ঢাকাবাসীরা যে প্রতিনিয়ত একে অন্যের ব্যক্তিগত বলয় আক্রান্ত করে তাঁর তাৎপর্য কি? আমার এক নরওয়েজিয়ান শিক্ষক বলেছিলেন বাংলাদেশের কেউ যদি বলে সে একা তাঁর খুব অদ্ভুত লাগে, সব জায়গাতেই এত মানুষ! ঢাকার মানুষের একাকীত্বের ধারনা বোধয় এরকম শরীরী না। একাকীত্বের চাইতে বিচ্ছিন্নতা কথাটা বেশি খাটে আমাদের জন্য। হয়তো এখানে একাকীত্ব যতটা মানসিক অবস্থা নির্ভর ততটা শরীরী বাস্তবতা না।

ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া নাকি এই নগরের তরুণদের বৈশিষ্ট। মানুষের ভাবপ্রবনতাকে সবসময় সমাজবিজ্ঞানীর মত কাটাছেঁড়া করতে যাওয়াটা অমানবিক মনে হয়। কারনা অধিকার আছে আবেগতাড়িত হবার? কারনা অধিকার আছে নিজেস্ব নির্জনতায় ডুব দিয়ে লীন হবার? নিজেকে বিশেষায়িত করার হক প্রত্যেকের নিজের আমি তাঁর যথার্থতা নির্ণয়ের কেউনা।

আমি কয়েক কোটি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা নাগরিক মধ্যবিত্তের একজন। চৈত্রের কড়া রোদে, ঘামে আঠালো দুপুর থেকে আমিও মুক্তি চাই। নিজের ভেতরের ভাবপ্রনতায় লীন হতে চাওয়া ছাড়া আমার আর উপায় নাই। আশে পাশে অনেক খণ্ড খণ্ড রুঢ় সত্য। তাঁদের বাস্তবতায় আক্রান্ত না হতে চাইলে নিজেস্ব ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া ছাড়া আর উপায় কি?

এই ভাবাবেগে ভেসে যেতে যেতে মনে হয় এই লক্ষ কোটি মানুষের গা ঘেঁষাঘেঁষির এই শহর কোনদিন কি আমার ছিল?! জন্মভূমি আর জন্মের শহরের সাথে মানুষের আসলে কিভাবে সম্পর্ক হয়? বর্তমানের বিশ্ব নাগরিকের মানস কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আত্নপরিচয়ের মূল সন্ধানী মানুষেরা জন্মভূমি, জন্মের শহরকে কিভাবে দেখেন আমি জানিনা। আমি দেখি একটা নিছক সীমারেখা হিসেবেই, যার ভেতরে নিত্য ক্রিয়াশীল ঘটনার মধ্যদিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে মানুষ। সামাজিকীকরন, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস সবকিছু মিলে তৈরি হয় স্মৃতি। আমার কাছে এই স্মৃতিই আমার দেশ, আমার শহর।

যতবার দেশের বাইরে থেকে ফিরেছি মনে হয়েছে কোথায় যেন একধরনের শুন্যতা তৈরি হয়েছে। আমার নিত্যদিনের ঢাকা আর সেই ঢাকা নেই। বাস্তবতার উপলব্ধির সাথে সাথে আমার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এটাই শেষ না। আমি একটি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি। ঢাকা তাঁর সমস্ত কদর্যতা আর নির্মমতা নিয়ে আমাকে আক্রান্ত করলে সচ্ছল মধ্যবিত্ত হিসেবে আমার পালাবার জায়গা আছে। হুমায়ূন আজাদ, সাগর-রুনি, বিশ্বজিত, রাজীব, অভিজিত আরও কত শত নাম না জানা গুম খুনের  ঢাকায় আমি তাই আসলে বহিরাগত। এই শহরে আমার কোন সম্পৃক্ততাই আসলে আমার আত্মার যোগ না। তাই প্রতিবাদ সমাবেশে একাত্নতা প্রকাশ করি কেবল ছবি শেয়ার দিয়ে, সশরীরে উপস্থিত থাকেন সেই হাতে গোনা কয়েকজন চেনা মুখ। অভিজ্ঞতা থেকে জানি তারাও অবাক হন্না এতে।

বর্ণবাদ বিরোধী এক কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ফ্রেডারিক ডাগলাসের  আত্নজীবনী পড়েছিলাম। অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ভূমিকায় বলেছিলেন “গরম কেৎলির বাষ্প বেরনোর পথ না থাকলে কেৎলি ফেটে যায়, তেমনি দাসত্ব প্রথার ভেতরের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের একটা নিয়মিত বিমক্ষোণ না ঘটলেও প্রথা ভেঙ্গে পড়তে পারে।” মধ্যবিত্তের বিমক্ষোণ মনে হয় এই ক্ষুদ্র প্রতিবাদগুলো আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তোলপাড় করায়। নইলে বোধয় গনপ্রজাতন্ত্রের এই আঁটসাঁট ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়তো অচিরেই।

তবুও আমি বিশ্বাস করি আমরা বাধ্য অনুগত প্রজা থাকিনা সব সময়। শাহাবাগ যারা দেখেছে তারা মানবেন যে বাঙালী আত্নসন্মানে আঘাতের জবাব দেয়। রাজনীতির দৃশ্যমান মঞ্চে যে অভিনয় চলে তাঁর পেছনেই আসল ক্ষমতার খেলা। সেই খেলা জনগণের ক্রোধের অর্জনকে ছিনতাই করেছে বার বার। ৭১এও, শাহাবাগেও। আজো অভিজিতের হত্যা ব্যাবহারীত হচ্ছে নানান রাজনৈতিক চালে। কিন্তু তবুও আমরা আশা করি। প্যানডোরার সেই বাক্স উপহার দিয়েছে শাসক গোষ্ঠী। গুম, খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন সবই ছড়িয়ে পড়েছে, আমাদের আছে কেবল আশা। লক্ষ কোটির গা ঘেঁষাঘেঁষির শহরে আমরা সত্যি একা!

তোমার কন্যাদ্বয়ের যেন তোমার মত প্রেমিক না জোটে!

বসন্তের এই কোমোল রোদে তোমাকে তোমার বৌয়ের সাথে হাঁটতে দেখে আমাদের সময়গুলো মনে পরে গেল। বয়সে সাত/আট বছরের ছোট ছিলাম বলেই কি আমার প্রতি তোমার আকর্ষণ ছিল? একবার এক কিশোরী ফেসবুকে তোমাকে বন্ধু করেছিল বলে আবেগে আহ্লাদিত হয়ে বলেছিলে “মেয়েটাকে একটা ধন্যবাদ দিতে হবে”। আগে বুঝতামনা এখন বুঝি অল্প বয়সের নারীসঙ্গ পুরুষকে তারুন্যের অনুভূতি দেয়, তাই চিরতরুন থাকার উপায় হিসেবে তোমার মত পুরুষেরা কাঁচা বয়সের নারীসঙ্গ খোঁজে প্রতিনিয়ত। মানুষের কাছে শুনতাম, নিজেও বোলে-চালে বুঝিয়ে দিতে তুমি অনেক ধনী। তোমার এক নারী বন্ধুকে তুমি ল্যাপটপ উপহার দিয়েছিলে, জানতে পারি তখন যখন কিভাবে গিফট র‍্যাপ করবে সে বিষয়ে পরামর্শ চাইলে। কিছুদিন পরে যখন খোঁজ নিলাম জানালে ওই দিনই তুমি তাঁর বাসায় গিয়ে উপহার বুঝিয়ে দিয়ে এসেছো। তোমার ওই বন্ধুটি নাটক আর বিজ্ঞাপনের এক পরিচিত মুখ। তোমার ভাষ্যমতে তাঁর তোমাকে প্রেমিক হিসেবে পাবার আকাঙ্খা আমাকে বিচলিত করেনি। দামী উপহারের সাগরে তাঁকে ভাসিয়ে রাখলেও হয়তো আমার তেমন কিছু যেত আসতো না কারন ওই সময়ে আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছিলাম। এরকম অনেক “আকর্ষণীয়” নারীরাই তোমার আশে-পাসে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতো। আমি একদমি তাঁদের মত ছিলাম না, কোনভাবেই না। মানুষ ভেদে বোধয় উপহারের ভিন্নতা দ্যাখা যায়। তাইতো যে তুমি বন্ধুদের পিছনে খোলা হাতে খরচ করবার গল্প দিতে, চেনা বন্ধুকে ল্যাপটপ, অচেনা নারী ভক্তদের দামি উপহার দিতে সেই তুমি আমার জন্য রাস্তা থেকে দোলন চাঁপার তোরা ৬০ টাকায় কিনবে কি কিনবেনা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেনা। তোমার কাঁধে ঝোলাবার একটা ব্যাগ ছিল। অনেক জিনিস পত্র ধরত ওতে। একদিন আমি জানতে চাই কোথা থেকে কিনেছো? বাণিজ্য মেলায় পাওয়া গেলে আমি একটা কিনবো। তুমি বলেছিলে “বাণিজ্য মেলায় এসব জিনিস পাওয়া যায়না, আমারটা পুরানো হয়ে গেলে তোমাকে দিয়ে দেব”। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি, কখনো কোন চাওয়া আমার অপূর্ণ থাকেনি। সম্পর্কের প্রথম দিকে তুমি আমার গাড়িতে ঘুরেছ, আমাদের বাসাতেও গিয়েছ, কন্যা হবার পরও আমার সৌখীনতাকে কতদূর উৎসাহিত করা হত বাসা থেকে তা তুমি জানতে। তবুও বোঝ নি কত যত্নে, ভালোবাসায় বড় হয়েছি আমি। তোমার কথা শুনে আমি আর এই বিষয়ে একটি বাক্যও ব্যায় করিনি। অনেক বড়লোক তুমি কিন্তু যে ছোটলোকী তুমি আমার সাথে করেছ, যে ছোটলোকী করে তুমি তোমার প্রতি আমার সন্মানবোধকে ছোট করেছ তাঁর তুলনা হয়না। তোমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব একেবারে প্রথম দিনেই খারিজ করে দিয়েছিলাম বলেই কি আমার জন্য এই আচরন উপযুক্ত মনে হয়েছিল তোমার? যার সাথে ভবিষ্যৎ নেই তাঁর পিছনে আবার বিনিয়োগ কিসের তাইনা?!

তোমার সাথে শারীরিক ভাবে অন্তরঙ্গ হবার প্রাথমিক দিনগুলোতে একদিন জানতে চেয়েছিলে আমি জিন্স পড়ি কিনা। তোমার বলার ভঙ্গী থেকে বুঝতে পেরেছিলাম ওটা তোমার খুব পছন্দের পোশাক। গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজে পড়া অন্তর্মুখী আমার তখনো মনে হয়নি কোন পুরুষকে ভালোলাগা দেবার জন্য নিজের স্বস্তির বাইরের কোন পোশাক পড়তে হবে। ক্যামন যেন বিদ্রুপের একটা হাসি হেসেছিলাম যেদিন বিয়ের পর তোমার পুরোদস্তুর সুশীল ধাচের বৌকে জিন্স-টি-শার্ট পরে কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে হাঁটতে দেখি। বিন্দু মাত্র অসন্মান করতে চাইছিনা আমি সেই নারীকে। আমি নিশ্চিত তোমাকে ভালোবাসেন বলেই তোমার পছন্দ-অপছন্দের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পেরেছেন তিনি। হাসি পেয়েছিল কেবল এটা ভেবে যে পুরুষের তুচ্ছতম আকাঙ্ক্ষা না মেটানো পর্যন্ত বোধয় নারীর মুক্তি নেই।

একদিন তোমার বাসায় গিয়েছি। খুবি ইচ্ছা করছিল ভক্তি বিনম্র মন নিয়ে তোমার কাঁধে মাথা রাখবো, কিছুক্ষন নীরবতার অদ্ভুত আশ্চর্য সুর শুনবো। তুমি তোমার কোলে বসার মিনিট খানেকের মধ্যে বোঝালে আমাকে শারীরিকভাবে পেতে চাইছো। আমি বল্লাম না। তুমি আমাকে নামিয়ে দিয়ে তোমাকে স্পর্শ করতে মানা করলে। স্পর্শে নাকি তোমার শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে! আমি তোমার পায়ের কাছে বসেছিলাম। তোমার ওই কথার অর্থ যে কি আমি আসলে তা বুঝিনি। আমি তোমার আশ্রয় পাবার জন্য এতটাই ব্যাকুল ছিলাম যে নীচে বসেই তোমার হাঁটুতে মাথা রাখলাম। তুমি প্রথমবার সরিয়ে দিলে। তখনো বুঝিনি ক্যানো, তাই আবারো মাথা রাখলাম। এবার তুমি এতটাই রূঢ়ভাবে সরিয়ে দিলে যে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এখনো ভাবি উনিশ,কুড়ির এক সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, ভালোবাসার জন্য ব্যাকুল তরুণীর এমন রূঢ় আচরনকি কোনভাবেই প্রাপ্য ছিল? তখনি আবার মনে পরে এটা তো সেই দেশ যেখানে নারী তো বটেই শিশু ও চুরান্ত নৃশংসতায় ধর্ষিত হয়। আমারতো আসলে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ যে “কামনার” বশবর্তী হয়ে তুমি আমাকে ধর্ষণ করোনি! সত্যি তুমি এবং তোমার মত পুরুষদের মহানুভবতার এত ঋণ আমরা নারীরা শুধবো কি করে?! চরম সৌভাগ্য আমার যে পুরুষের বিকৃত, আগ্রাসী যৌনতার উৎকটতম রূপটা অন্তত আমাকে দেখতে হয়নি তোমার সাথে। আর যদি দেখতে হত, যদি ধর্ষিত হতাম তাহলে সমাজতো প্রস্তুত ছিলই নষ্টা, দুশ্চরিত্রা, পতিতা বলে তোমার বিকৃত যৌনতাকে বৈধতা দিতে, আমি যে নিজে তোমার বাড়িতে গিয়েছি! আর কি প্রমান দরকার যে আমি খারাপ মেয়ে?!

প্রথম যেদিন আমার হাত ধরলে চমকে উঠেছিলে, জানতে চেয়েছিলে আমার হাত এত ঠাণ্ডা ক্যানো। আমাকে হাত মোজা কিনে দেবে কিনা জানতে চেয়েছিলে। হাসি চেপে আমি বলেছিলাম না। তুমি তখন বল্লে তুমি নাকি খুবি মা সুলভ, মায়ের মত যত্ন নাও। শরীরী অন্তরঙ্গতার একদিন জানতে চাইলে আমি এই ধরনের ব্রা পড়ি ক্যানো?! আমি আকাশ থেকে পড়েছিলাম! অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম ক্যানো কি হয়েছে তাতে?! তুমি বল্লে ওগুলোতে শেপ নষ্ট হয়ে যায় এবং আমার ফোমের ব্রা ব্যাবহার করা উচিৎ কারন ওতে স্তনের শেপ ঠিক থাকে। বলে আবারো জানতে চাইলে আমাকে আমার জন্য উপযুক্ত ব্রা কিনে দেবে নাকি?! এই বিকৃত সমাজে যেখানে নারীর শরীরী সৌন্দর্য তাঁর সামাজিক মর্যাদার নির্ণায়ক সেখানে কোন কোন মা তাঁর কন্যার স্তন, নিতম্বের আকৃতি নিয়ে চিন্তিত হলে হতেও পারেন। তুমি সেই বিকৃত পুঁজিবাদী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ, আর তাই উৎকটতম প্রতিনিধি আসলে তুমিই। আর তাই মা সুলভ মমতার নাম দিয়ে তুমি আমার শরীরের উপর নজরদারি করতে চেয়েছ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভণ্ডকেও তুমি, তোমার মত পুরুষেরা হার মানাবে। আর কি বা পারো তুমি? হৃদয় দিয়ে হৃদয় জয় করার যোগ্যতা তো তোমার স্পষ্টভাবেই ছিলনা, তাই অধিকার করতে চেয়েছ। অধিকার করতে চেয়েছ তাই যা তোমার হাতের নাগালে ছিল। মন পর্যন্ত যাবার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে সেই মানসিক উৎকর্ষতাইবা তোমার ছিল কোথায়? দুটো শরীর কাছাকাছি আসাটাই যদি নারী পুরুষের নৈকট্যের চরম লক্ষণ হবে তাহলে তোমাকে বন্ধু অন্তত বলতে পারতাম। দুঃখজনকভাবে তুমি আমার বন্ধুও হতে পারোনি। তুমি ধনী হতে পারো, সফল হতে পারো, বিখ্যাত কিংবা নারী-পুরুষের আকাঙ্ক্ষার পাত্র ও হতে পারো কিন্তু প্রেমিক তুমি কোনোভাবেই নও, ছিলেনা। না ছিল তোমার ভালোবাসবার যোগ্যতা, না ছিল ভালোবাসা সন্মানের সাথে গ্রহন করবার যোগ্যতা। তোমার গা দিয়ে সফলতা, খ্যাতি আর টাকার যে বোটকা গন্ধ বের হয় বিশ্বাস কর তাতে আমার বমি চলে আসে। অথচ শুনেছিলাম তোমার পারফিউম আসে সুদুর অ্যামেরিকা থেকে! হায়! তোমার জন্য করুনা ছাড়া কিছুই নেই আমার।

সর্বশেষ খবরে শুনেছিলাম তোমার নাকি দুটি কন্যা সন্তান হয়েছে। বিশ্বাস কর আর নাই কর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ওদের জন্য শুভ কামনা রইলো। কেবল প্রার্থনা করি তোমার কন্যাদ্বয়ের যেন তোমার মত প্রেমিক না জোটে।