ভাষা কি আমার অভিজ্ঞতার ধারক?

উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিষয়ে আমার একাডেমিক ট্রেনিং আছে। নিও লিবারাল অর্থনীতির যুগে সমাজ বিজ্ঞান সহ অন্যন্য সকল বিভাগের মত এই বিভাগটিও এনজিও মুখী পড়াশোনা দিয়ে খুব বেশি মাত্রায় প্রভাবিত ছিল। নিজের পড়ার আগ্রহের কারনে অথবা অন্য যে কারনেই হোক ততোদিনে আমার বিভাগ নিয়ে মোহভঙ্গ হয়েছে। বিভাগের বাইরে এসে যখন প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহলে পাঠচক্র, আলোচনার সাথে পরিচিত হলাম তখন নারী বিষয়ে কতগুলো নতুন শব্দবন্ধের সাথে পরিচিত হয়েছি যা আমার একাডেমী আমাকে শেখায়নি। যেমন নারী ইস্যুতে আলোচনা করতে গেলে “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা প্রায়ই ব্যাবহার হতে শুনেছি।

প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও এই টার্ম/শব্দবন্ধের কিছু সুবিধাজনক দিক আছে আবার কিছু অসুবিধার দিকও আছে। সুবিধা হোল এটা নারী পুরুষকে একসাথে সম্বোধন করে। কেবলমাত্র নারীকে নিয়ে অনেক বেশি আলো ফেলে পুরুষের করনীয়কে অদৃশ্য করে দেয়না যেটা বিভাগের পড়াশোনায় প্রায়ই দেখেছি। কেউ যেন এটা না বোঝে যে আমি মনে করছি নারী অবস্থা নিয়ে আলোচনা কম হওয়া উচিত। আমার বরং মনে হয় নারী ইস্যুতে যথেষ্ট গুরুত্ব ও প্রাধান্য নিয়ে আলোচনা হয়ইনা একরকম। আমার মতে “জেন্ডার” ধারনাটা আলোচনায় না এনেই “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা একই সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নারী পুরুষ সম্পর্কে উপযুক্ত আচরনবিধি কি হতে পারে সেই সম্ভাবনার দিকে আলো ফেলে। এই শব্দ বন্ধের সবচাইতে সফল দিক আমি মনে করি এটাই।

যখন এটা নারী জীবনের সমস্ত দিকের বা ইস্যুর প্রতিস্থাপক হয় তখন “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা শুনলে আমার গায়ে জ্বালা ধরে যায়। পুরুষের সাথে সম্পর্কের বাইরে নারী নাই নাকি?!! আজ যদি আমি সমকামী হই বা যদি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শের কারনে পুরুষের সাথে যৌন সংসর্গ থেকে শুরু করে সমস্ত সম্পর্ক বর্জন করি আমার কথা কি তাহলে এই টার্মটা বলতে পারবে?! আমি গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজে পড়েছি, আমি নিশ্চিত চাইলে এমন এমন প্রতিষ্ঠানে আমি সারাজীবন পার করতে পারি যেখানে কোন পুরুষ নাই। তাতে আমি কি বৃহত্তর যে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আছে তাঁর নিপীড়নের বাইরে থাকবো? তাহলে পৃথকীকরণ ব্যবস্থায় থাকা নারীরা সবচাইতে নিপীড়ন মুক্ত থাকতো বলা যায়। আমি মনে করি এনজিও প্রকল্পের বাইরে সমকামিতা, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বজনের আলোচনা খুব কম হয়েছে। সেটার সাথেই তাল মিলিয়ে নারীর জীবনের এই প্রশ্নগুলো আজো অনুচ্চারিত আছে।

কেবল নারীর সাথে সম্পর্কে থেকেও নারী ও আরো অনেকেই পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই যদি হয় তাহলে নারী জীবনের সমস্ত প্রশ্নকে “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” টার্ম দিয়ে রিপ্লেস করা অর্থহীন। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতেও “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা কিছুটা অনুপযোগী। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর সম্মতিতেও বৈধ হয়। যে পুরুষ পাবলিক প্লেসে অচেনা (তাঁর সাথে সম্পর্কে না থাকা) নারীকে যৌন হয়রানী করে সে তাঁর বউয়ের কাছে আদর্শ পুরুষ হতে পারে। বউয়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক মধুর হতে পারে। তাহলে তাঁর এই নারী বিদ্বেষী আচরন কি “নারী-পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা ব্যাখ্যা করতে পারে?

ফুকোর একটা কথা আছে “Self is the sight of multiple practices”  সহজ বাংলায় বলতে গেলে এটা বোঝায় মানুষ নিজে বহুবিধ চর্চার একটা ক্ষেত্র। এর সহজ একটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে পুরুষের ক্ষেত্রে। যে পুরুষ পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানী করে, সেই পুরুষ হয়তো তাঁর কন্যা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। তাঁর প্রতি অসন্মানের দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও কিছু সুবিধা তাঁর স্ত্রী, কন্যাকে দিচ্ছে, এমনভাবে যাতে পুরুষ হিসেবে তাঁর প্রভু অবস্থার কোন সংকটে পড়ছেনা। “নারী পুরুষ সম্পর্ক” কথাটা ঐ পুরুষের পাবলিক প্লেসে হয়রানী করার কথাটা উল্লেখ করতে পারেনা। এই টার্ম ঐ পরুষের নিপীড়নকারী স্বভাবকে নতুনভাবে চিহ্নিত করার জন্য শুন্যতা তৈরি করে, সাথে সাথে সম্পর্কে থাকা নারীদের প্রতি নুন্যতম মানবিক আচরন চিহ্নিত করায় তাকে হয়তো আরও সচেতন করে তোলা যায় সেই পথ দেখায়।

কোন কিংবদন্তী দার্শনিক পুরুষের নারী বিষয়ক অবস্থান বুঝতেও টার্মটা যথেষ্ট না। এটা নারীবাদের, নারীর, পুরুষের জীবনের একটা অংশ হতে পারে মাত্র, একটা কিন্তু কম জরুরী না মোটেও। নারীর সাথে সম্পর্কে না থেকেও পুরুষের, নারীর বা যে কারো নারী সম্পর্কে ভাবনা থাকতে পারে। যেটাতে ধর্ম, সংস্কৃতি, বিদ্যমান সমাজের আদর্শ প্রতিফলিত হতে পারে। সেই যে কেউ পুরুষতান্ত্রিক কিনা তা বুঝতে এই টার্মটা আমার একেবারেই যথেষ্ট মনে হয়না। এটা খুবি জরুরী কিন্তু একটা দিকে আলো ফেলে মাত্র।

কোন প্রতিষ্ঠানের নারী-পুরুষের কোড অফ কন্ডাক্ট বা উপযুক্ত আচরণবিধি কেমন হবে সেই বিষয়ে বলতে এই টার্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি বা তাঁর আদর্শ অবস্থান বোঝাতে “নারীপুরুষ সম্পর্ক” কথাটা যথেষ্ট না। কেউ নারী বান্ধব কিনা, নারী বিদ্বেষী কিনা তা এই টার্মটা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

আর একটা শব্দ যেটা প্রায়ই আলোচনায় শুনি সেটা হোল “ব্যাটাগিরি”। অনুমান করি “ম্যাস্কুলিনিটি” শব্দের চলতি বাংলা এটা। শব্দটা আমার খুবি পছন্দের কারন এর সহজবোধ্যতা। আমি “ম্যাস্কুলিনিটি” বিষয়ক একটা গবেষণার অনুবাদের অংশ ছিলাম। তখন এই শব্দের বাংলা করেছিলাম “পৌরুষ”। ভদ্রলোকী বাংলা এটা কোন সন্দেহ নাই। এটার চাইতে বরং “ব্যাটাগিরি” শব্দটা মানুষের সাথে অনেক বেশি যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু এই শব্দের সমস্যা হোল এটা সহিংস, আগ্রাসী, মাতব্বর সুলভ কিছু পুরুষালী বৈশিষ্ট্য বোঝায়। তারমানে সহিংস, আগ্রাসী আলগা কিছু পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের পুরুষের আদলটাই এটা সামনে আনে। নরম, কোমল, ব্যর্থ, অসফল পুরুষগুলোকে নয়।

আমার বিভাগের এক শিক্ষক একবার বলেছিলেন বিভাগ এক্টিভিজম জায়গা না। তাঁরা হয়তো মনে করেন এক্টিভিজমের জন্য এনজিও আছে! এযাবৎ পর্যন্ত মানব সভ্যতায় নারী অধিকার সহ যা কিছু অর্জন হয়েছে তাঁরা হয়তো মনে করেন সেটা এনজিওর দান! তাই এক্টিভিজম এনজিওর হাতে ছেড়ে দিয়ে বিভাগে জনবিচ্ছিন্ন, “বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা” করতে করতে চান তাঁরা। নারীবাদতো আসলে “উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ” নামে দুনিয়াব্যাপী যত বিভাগ আছে তাঁদের আবিষ্কার! তাঁদের উচিত শব্দগুলো প্যাটেন্ট করে রাখা! একাডেমীক জ্ঞান আসলে কতটা জন বিচ্ছিন্ন হতে পারে তাঁর প্রমান এটা।

শব্দের জন্ম, টার্ম নিয়ে কাড়াকাড়ি দেখে কিছু বিষয় উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে হয়। নারী বান্ধব, নারীবাদী একটা শব্দের উচ্চারন, উল্লেখ আসলে একটা জরুরী বিষয়। শব্দ কেবল ভাষাকে নির্দেশ করেনা, এটা অভিজ্ঞতার বাহক। স্মৃতি তথা ইতিহাসের ধারক। পতিতা, সতী ইত্যাদি শব্দের পুরুষবাচক শব্দ না থাকা যেমন নির্দেশ করে নারী পরুষের পৃথিবীতে বাঁচে তেমনি যৌন হয়রানী, বিবাহ উত্তর ধর্ষণ নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতাকে মূর্ত করে। এগুলো জনমনে, জ্ঞানের জগতে ইতিহাসসৃষ্ট সত্ত্বা হিসেবে নারীর অভিজ্ঞতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তাই নারীর অথবা যে কারো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শব্দ যেমন কোন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হতে পারেনা, তেমনি হতে পারেনা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এক্টিভিজম, আর জ্ঞানচর্চা পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা হতে পারেনা। নারীর নিপীড়নের বাস্তব অভিজ্ঞতায় যেমন একাডেমী/বিভাগের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ হতে হবে তেমনি বিভাগের জ্ঞানকে উৎসাহিত করতে  হবে সমাজ পরিবর্তনের দরকারি কাজগুলো করতে। পারস্পারিক আদান প্রদান ছাড়া জ্ঞান জনবিচ্ছিন্ন, স্থবির একটা বিষয়ে পরিনত হতে বাধ্য।

আত্নপরিচয়ের সংকট আর গ্ল্যামারাস সমঅধিকার

ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের ভালো চাকরি পাবার চেষ্টা দেখা একটা বেদনাদায়ক বিষয়। এরা ক্ষমতার সামনে যে আচরন করে তা থেকে মধ্যবিত্তের নৈতিক অধপতন টের পাওয়া যায়। ভালো চাকরি পাওয়ার আশায়, সফল, চকচকে জীবন পাওয়ার আশায় তারা ক্ষমতার সামনে যেভাবে মাথা নত করে তা ভাবলে আজো আমার গায়ে কাঁটা দেয়। গা গোলাতে থাকে, রীতিমত বমী পায় ভাবলে যে এর অর্থ স্রেফ সমস্ত সৃজনশীলতা বর্জন করে কেরানীর মত হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলানো। তাঁর(অধিকাংশ সময় পুরুষ শিক্ষকের) কথায় কথায় নানান জাতের অপমানকে রসিকতা হিসেবে, স্নেহ হিসেবে নিয়ে মুগ্ধতার ভান করা। এর চর্চা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। সবচাইতে বেশি যে শিক্ষক এনজিওর প্রোজেক্টে কাজ করেন তাঁর আশে পাশেই পাওয়া যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের “বিরল প্রতিভাদের”। শুনতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের মাস্টারের বাড়ির বাজার করলে, ফাই ফরমাশ খাটলেই নাকি শিক্ষক হওয়া যেত! ছাত্ররা হয়তো এতটুকু করেই পার পেতেন, অনুমান করি ছাত্রীদের আরও অনেক কিছুর ঝুঁকি ছিল। রাজি না হলে, অন্তত দাস সুলভ আনুগত্য না দেখালে ছাত্রীর চরিত্র হনন। আমি নিজেওতো এর শিকার। বিশ্বাস হয়না এরা দেশের সর্বচ্চো ডিগ্রিধারী, সর্বচ্চো নম্বর পাওয়া ছাত্র, ছাত্রী। আশ্চর্য লাগে ভাবলে এমন মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব করার আগে তারা নিজেদের কাছেওকি একবার লজ্জিত বোধ করেনা?! এতো কেবল আচরণগত দিক! আমার বিভাগের সিলেবাসে এনজিওর প্রকল্পের এত জাতের বিবরনের হেতু আমি কোনভাবেই খুঁজে পেতাম্না! উন্নয়ন বিষয়ে বিভাগ, পড়াশোনা আপেক্ষিকভাবে নতুন, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে কিন্তু তাতো মৌলিক বইগুলো থেকে কোনভাবেই বেশি জরুরী হতে পারেনা। নারীবাদের মৌলিক বইগুলোর সাথে আদর্শিক বৈপরীত্যের সাথে সাথে এনজিওর ভাষার যে পার্থক্য তাতে অবাক না হয়ে পারতামনা। আশ্চর্য হয়ে দেখতাম নারীবাদের ক্ষুরধার, স্বচ্ছ রাজনৈতিক বক্তব্যের সামনে এনজিওর, প্রোজেক্টের ভাষা কি পরিমান নির্বিষ আর ভোঁতা!

আমার সময়ের সবচাইতে জরুরী লেখক অরুন্ধতীর কথা না বলে পারিনা। ২০০০ সালের মার্চে তিনি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরামে আলোচক হিসেবে হেগে যান। সাড়ে তিন হাজার প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক, ব্যাবসায়ী, মন্ত্রী, ব্যাংকার পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হন। প্রত্যেক বক্তৃতা সেখানে শুরু হয় “নারীর ক্ষমতায়ন”, “জনগণের অংশগ্রহন” শব্দবন্ধ দিয়ে অথচ তারা যা করতে চাইছে তা হোল বিশ্বের পানির প্রাইভেটাইজেশন! কে না জানে এতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ নারীরা যাকে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়। অরুন্ধতীর মতে তাই ঐ ফোরামের অভিজ্ঞতা ছিল একজন লেখকের দুঃস্বপ্নের মত। একজন লেখক যেখানে সারাজীবন পার করেন ভাষা এবং চিন্তার মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে সেখানে ঐ ফোরামে চেষ্টাই যেন ছিল নিজেদের অসৎ, অন্যায্যভাবে মুনাফা কামানোর উদ্দেশ্যকে ভাষার মুখোশ পরানো! এনজিওর প্রোজেক্টের ভাষার এই ফাঁদ, চাতুর্য অরুন্ধতীর ঐ লেখায় আমার কাছে সবচাইতে ভালোভাবে স্পষ্ট হয়। মারিয়া মাইস তাঁর “সার্চ ফর এ নিউ ভিশন” বইতে প্রায় একই কথাই বলেছেন। তাঁর সময়ের নারী আন্দোলনের কর্মীরা আবিষ্কার করে যে তাঁদের নারী আন্দোলনের ইতিহাস কিভাবে পদ্ধতিগতভাবে একাডেমীর পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তারা এই সত্যও উপলব্ধি করেছে যে তাঁদের পূর্বের নারী আন্দোলনের কর্মীদের দাবি দাওয়া তাঁদের তুলনায় ছিল বহুলাংশে র‍্যাডিকাল।

আজকের দিনে ফেয়ার এন্ড লাভলি আমাকে সমান অধিকারের জ্ঞান দেয়। নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ যখন ঘোষণা দেয়া হয় তখন সমান অধিকার ইসলাম পরিপন্থী বলে যারা মাঠ গরম করছিলেন জানতে ইচ্ছা করে আজ তারা কোথায়? নাকি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা আর অর্থের সামনে তাঁদের ইমানি জোশ ঝিমিয়ে পরে?!

একদিকে ধর্মান্ধদের চোখ রাঙ্গানি, অন্যদিকে ফান্ডের টাকায় “নারী আন্দোলনের” গতি প্রকৃতি নির্ণয়। আরও আছে অধিকারের নামে রাষ্ট্রের ভাঁওতাবাজি। এতসবের মাঝে সাধারন শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত পেশাজীবী নারীর যে নিত্যদিনের সংগ্রাম তা দিশা হারাতে থাকে। পৃথিবীর তাবৎ বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মানুষের বিদ্রোহের ভাষা যেভাবে ছিনতাই হয় নারীর বিদ্রোহের ভাষা, ধিক্কারের ঝাঁঝ তেমনিভাবে ছিনতাই হয় প্রতিদিন। খণ্ডিত, লাঞ্ছিত হয়ে ঠাই নেয় প্রোজেক্ট পেপারে। এ আর অবাক কি প্রোজেক্টের উচ্ছিষ্টভোগীরাই বলবে “ফান্ড ছাড়া বাংলাদেশে কোন নারী আন্দোলন হবেনা”!

আন্তর্জাতিক নারী বর্ষও তাঁর দ্রোহের আগুনে পোড়া ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের সফল সম্মেলন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ঘোষণা দেন ক্লারা জেটকিন। আজকের অফিসিয়াল দলিলে ক্লারা জেটকিনকে যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর তেমনি দুষ্কর সমাজতন্ত্রী শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নারী দিবসকে খুঁজে পাওয়া।

নারীবাদের বাইবেল “দ্বিতীয় লিঙ্গের” লেখক সিমোন দ্য বুভোয়ারের নারী দিবস নিয়ে সন্দেহ যায়না। তিনি এটাকে শ্রমজীবী নারীর সংগ্রামের অর্জন হিসেবেই জানেন। তাঁদের সংগ্রামের ইতিহাস থেকে ছিনতাই হয়ে তাই ৮মার্চ যখন কেবল জাতিসংঘের ঘোষিত দিবসে পরিনত হয় তখন তিনি সাবধানবানী উচ্চারন করেন। নারী আন্দোলনকে কব্জা করার জন্যই, ঝড়কে শান্ত করার জন্যই আজকের এই নারী দিবস।

মধ্যবিত্তের মানস কাঠামোয় ফেয়ার এন্ড লাভলির সমঅধিকারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাঁদের কাছে নারীর সমঅধিকার মানে মধ্যবিত্ত, অভিজাত নারীর পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে গ্লসি, চকচকে জীবনের অধিকার। গালভরা নামের, বড় বড় আন্তর্জাতিক এনজিওর নানান প্রোজেক্টের বাক বাকুম! সমাজ, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন এই গ্লসি সমঅধিকারের ডামাডোলে শ্রমজীবী নারী, বৃত্তের বাইরে এসে আত্নপরিচয় সন্ধানী মধ্যবিত্ত নারীর কণ্ঠস্বর চাপা পড়তে থাকে প্রতিনিয়ত। বাবা, মার সাথে টিভি দেখতে বসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির গ্ল্যামারাস সমঅধিকারের প্রচারনা দেখে আমি লজ্জিত হই। ভাবি আত্নপরিচয়ের সংকটে থাকা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঐ গালভরা নামগুলো জপতে না পারলে নারীর অধিকারও বোঝে না, তাঁর নিত্যদিনের সংগ্রামও বোঝেনা। নারীর অধিকার ছেলের হাতের মোয়া না, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ছাড়া একে অর্জন করা যায়নি কখনো যাবেওনা।

এই আমি ছোটবেলায় আঁকিয়ে হতে চেয়েছি। সেই ইচ্ছা হত্যা করা হয়েছে ইসলামের নামে। বিজ্ঞান না মানবিক শাখায় পড়তে চেয়েছি, সেই ইচ্ছা হত্যা হয়েছে সফল জীবনের নামে। আজ শ্রমজীবী, নিগৃহীত মধ্যবিত্ত নারীর স্বার্থের পক্ষে থাকতে চাই সেই সম্ভাবনা হত্যার পায়তারা চলছে ফেয়ার এন্ড লাভলির গ্ল্যামারাস সমঅধিকার, আর গালভরা নামের এনজিওর চকচকে চাকরির নামে। তবুও আমি সমঅধিকারের ন্যায্যতায় দৃড় বিশ্বাসী, তাই অরুন্ধতীর কথা দিয়েই শেষ করি “আমার বিশ্বাস এই মানচিত্রের প্রতিটি নাগরিকই সাম্রাজ্যবাদের ভোক্তা নয়। কম হোক বেশি হোক তাঁদের কেউ কেউ অন্যদের নিয়ে ভাবে………আসল সত্য বুঝতে হলে এই বৃত্তের বাইরে এসে অন্যদের কথা, অন্য গল্প শুনতে হবে।”

তথ্যসূত্রঃ

১) দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে, সিমোন দ্য বুভোয়ার ও অ্যালিস শোয়া্রজার-এর আলাপচারিতা, আলম খোরশেদ সম্পাদিত

২) সার্চ ফর এ নিউ ভিশন, মারিয়া মাইস

৩) দি অ্যালজেব্রা অফ ইনফিনিট জাস্টিস, অরুন্ধতী রায়

৪) মুক্তস্বর, বিপ্লবী নারী সংহতি

৫) দানবের রূপরেখা, অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকার, হাসান মোরশেদ

তোমাদের এই শহরে

IMG_6044 IMG_6048                             অজুতে নিজুতে ঢাকাবাসীরা যে প্রতিনিয়ত একে অন্যের ব্যক্তিগত বলয় আক্রান্ত করে তাঁর তাৎপর্য কি? আমার এক নরওয়েজিয়ান শিক্ষক বলেছিলেন বাংলাদেশের কেউ যদি বলে সে একা তাঁর খুব অদ্ভুত লাগে, সব জায়গাতেই এত মানুষ! ঢাকার মানুষের একাকীত্বের ধারনা বোধয় এরকম শরীরী না। একাকীত্বের চাইতে বিচ্ছিন্নতা কথাটা বেশি খাটে আমাদের জন্য। হয়তো এখানে একাকীত্ব যতটা মানসিক অবস্থা নির্ভর ততটা শরীরী বাস্তবতা না।

ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া নাকি এই নগরের তরুণদের বৈশিষ্ট। মানুষের ভাবপ্রবনতাকে সবসময় সমাজবিজ্ঞানীর মত কাটাছেঁড়া করতে যাওয়াটা অমানবিক মনে হয়। কারনা অধিকার আছে আবেগতাড়িত হবার? কারনা অধিকার আছে নিজেস্ব নির্জনতায় ডুব দিয়ে লীন হবার? নিজেকে বিশেষায়িত করার হক প্রত্যেকের নিজের আমি তাঁর যথার্থতা নির্ণয়ের কেউনা।

আমি কয়েক কোটি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা নাগরিক মধ্যবিত্তের একজন। চৈত্রের কড়া রোদে, ঘামে আঠালো দুপুর থেকে আমিও মুক্তি চাই। নিজের ভেতরের ভাবপ্রনতায় লীন হতে চাওয়া ছাড়া আমার আর উপায় নাই। আশে পাশে অনেক খণ্ড খণ্ড রুঢ় সত্য। তাঁদের বাস্তবতায় আক্রান্ত না হতে চাইলে নিজেস্ব ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া ছাড়া আর উপায় কি?

এই ভাবাবেগে ভেসে যেতে যেতে মনে হয় এই লক্ষ কোটি মানুষের গা ঘেঁষাঘেঁষির এই শহর কোনদিন কি আমার ছিল?! জন্মভূমি আর জন্মের শহরের সাথে মানুষের আসলে কিভাবে সম্পর্ক হয়? বর্তমানের বিশ্ব নাগরিকের মানস কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আত্নপরিচয়ের মূল সন্ধানী মানুষেরা জন্মভূমি, জন্মের শহরকে কিভাবে দেখেন আমি জানিনা। আমি দেখি একটা নিছক সীমারেখা হিসেবেই, যার ভেতরে নিত্য ক্রিয়াশীল ঘটনার মধ্যদিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে মানুষ। সামাজিকীকরন, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস সবকিছু মিলে তৈরি হয় স্মৃতি। আমার কাছে এই স্মৃতিই আমার দেশ, আমার শহর।

যতবার দেশের বাইরে থেকে ফিরেছি মনে হয়েছে কোথায় যেন একধরনের শুন্যতা তৈরি হয়েছে। আমার নিত্যদিনের ঢাকা আর সেই ঢাকা নেই। বাস্তবতার উপলব্ধির সাথে সাথে আমার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এটাই শেষ না। আমি একটি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি। ঢাকা তাঁর সমস্ত কদর্যতা আর নির্মমতা নিয়ে আমাকে আক্রান্ত করলে সচ্ছল মধ্যবিত্ত হিসেবে আমার পালাবার জায়গা আছে। হুমায়ূন আজাদ, সাগর-রুনি, বিশ্বজিত, রাজীব, অভিজিত আরও কত শত নাম না জানা গুম খুনের  ঢাকায় আমি তাই আসলে বহিরাগত। এই শহরে আমার কোন সম্পৃক্ততাই আসলে আমার আত্মার যোগ না। তাই প্রতিবাদ সমাবেশে একাত্নতা প্রকাশ করি কেবল ছবি শেয়ার দিয়ে, সশরীরে উপস্থিত থাকেন সেই হাতে গোনা কয়েকজন চেনা মুখ। অভিজ্ঞতা থেকে জানি তারাও অবাক হন্না এতে।

বর্ণবাদ বিরোধী এক কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ফ্রেডারিক ডাগলাসের  আত্নজীবনী পড়েছিলাম। অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ভূমিকায় বলেছিলেন “গরম কেৎলির বাষ্প বেরনোর পথ না থাকলে কেৎলি ফেটে যায়, তেমনি দাসত্ব প্রথার ভেতরের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের একটা নিয়মিত বিমক্ষোণ না ঘটলেও প্রথা ভেঙ্গে পড়তে পারে।” মধ্যবিত্তের বিমক্ষোণ মনে হয় এই ক্ষুদ্র প্রতিবাদগুলো আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তোলপাড় করায়। নইলে বোধয় গনপ্রজাতন্ত্রের এই আঁটসাঁট ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়তো অচিরেই।

তবুও আমি বিশ্বাস করি আমরা বাধ্য অনুগত প্রজা থাকিনা সব সময়। শাহাবাগ যারা দেখেছে তারা মানবেন যে বাঙালী আত্নসন্মানে আঘাতের জবাব দেয়। রাজনীতির দৃশ্যমান মঞ্চে যে অভিনয় চলে তাঁর পেছনেই আসল ক্ষমতার খেলা। সেই খেলা জনগণের ক্রোধের অর্জনকে ছিনতাই করেছে বার বার। ৭১এও, শাহাবাগেও। আজো অভিজিতের হত্যা ব্যাবহারীত হচ্ছে নানান রাজনৈতিক চালে। কিন্তু তবুও আমরা আশা করি। প্যানডোরার সেই বাক্স উপহার দিয়েছে শাসক গোষ্ঠী। গুম, খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন সবই ছড়িয়ে পড়েছে, আমাদের আছে কেবল আশা। লক্ষ কোটির গা ঘেঁষাঘেঁষির শহরে আমরা সত্যি একা!

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রযুক্তির ভূমিকা

ছবিটার সাথে লেখার কোন সম্পর্ক করা ঠিক হবেনা। ভালো লাগলো তাই দিলাম। আর লেখাটাও আর্কাইভ করার জন্য দেয়া তাই যা খুশি তাই করলাম :)

ছবিটার সাথে লেখার কোন সম্পর্ক করা ঠিক হবেনা। ভালো লাগলো তাই দিলাম। আর লেখাটাও আর্কাইভ করার জন্য দেয়া তাই যা খুশি তাই করলাম 🙂

শিল্পায়ন- প্রযুক্তি- অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কিত একটি ঘটনাঃ

প্রয়োজন উদ্ভাবনের জনক। মানুষ তাঁর নিজের প্রয়োজনে তৈরি করে প্রযুক্তি এবং তাকে ব্যবহার করে জীবনকে আরও বেশি সহজ করার জন্য। প্রযুক্তির বিকাশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর মানুষের জীবনের সকল ধরনের উৎকর্ষতা তাই হাতে হাত রেখে চলে। ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব তাঁর নিজের স্বার্থেই নিয়ে আসে প্রযক্তিগত উৎকর্ষতা ও আবিষ্কার। শিল্প বিপ্লব শুরু হয় ১৯৬০ সাল থেকে। তারপর একের পর এক আসতে থাকে তাতের উরন্ত মাকু, জ্বালানী হিসেবে কয়লা, সুতা কাটার যন্ত্র গ্রীবসনের “জেনি”, ক্লিপ্টনের “মিউল”।তারপর আসে কার্ট রাইটের বাষ্প চালিত তাঁত, আর জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন আসে ১৭৬৮ সালে শিল্পায়নকে দানবীয় গতিশীলতা দিতে। আক্ষরিক অর্থে শিল্প বিপ্লব বলতে যা বোঝায় তা আমাদের দেশে হয়নি। তাই শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে যে প্রযুক্তিগত ভিত একটি দেশে নির্মাণ হয় তা আমাদের নেই। ৭২ এর পর বাংলাদেশে বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠান যা ছিল তা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। কিন্তু দুর্বল ব্যাবস্থাপনার কারনে কোন শিল্পই আক্ষরিক অর্থে দাড়াতে পারলোনা। বিরাষ্ট্রীয়করন করা হলে এই শিল্পগুলো যে ব্যক্তিমালিকানার অধীনে গেল তাঁরা কেউই ব্যাবসায়ি বা উদ্যোক্তা ছিলেননা। শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হয়, নিত্য নতুন উদ্ভাবন করতে হয় যা করা সম্ভব হয়নি এই প্রতিষ্ঠানের মালিকদের। তাই শিল্প প্রতিষ্ঠানই যেখানে তাঁর সকল শক্তি নিয়ে বিকশিত হলনা প্রযুক্তি কিভাবে, কিসের প্রয়োজনেই বা বিকশিত হবে?

আদমজী- বাপেক্স- গার্মেন্টস সম্ভাবনাময় তিনটি শিল্পের বর্তমান হালচালঃ

আমরা শৈশবের পাঠ্য পুস্তক থেকেই আদমজী পাটকলের নাম জেনে গর্ব ও আনন্দিত বোধ করেছি, এটি এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক অভাবনীয় উদাহরন ছিল আদমজী পাটকল। ৫১ বছর ধরে আদমজী কোটি কোটি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নির্দেশ করেছে। আদমজীর দুর্বলতাকে ঘিরে সরকারের উদাসীনতা এবং অবশেষে সমস্যা সমাধানের দিকে না গিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা বাংলাদেশের অর্থ প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি স্থায়ী দাগ হিসেবে থেকে যাবে। বলা হয় বছরে গড়ে ৪০ কোটি লোকসান দিয়েছে আদমজী। কিন্তু কখনই এই ক্ষতির পেছনের কারন অনুসন্ধান করা হয়নি। চেষ্টা করা হয়নি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা আর উৎপাদন বইচিত্র আনার। ১৯৯০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ জি এস সাহোতা এসেছিলেন বাংলাদেশের শিল্প খাত নিয়ে গবেষণা করতে। তিনি বলেছিলেন ১৯৫০ এর দশকে সবচাইতে ভালো মেশিনপত্র নিয়ে এ দেশের পাট কলগুলো যাত্রা শুরু করেছিল। ৪০ বছর পর তিনি দেখছেন পাটকলগুলোতে সেই মেশিনপত্রই আছে কিন্তু ভারতে অনেক পরিবর্তন ও উন্নতি করা হয়েছে। অথচ ভারতের পাটকল ও বাংলাদেশের পাটকল যাত্রা শুরু করে প্রায় একই সময়ে। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ ও দক্ষ জনশক্তির অভূতপূর্ব সমাবেশ রয়েছে। ১৯১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশি বিদেশী কম্পানি মিলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে মোট ৭৫ টি, আবিষ্কৃত হয়েছে মোট ২৫ টি। অর্থাৎ সাফল্যের হার ৩:১ অন্যদিকে কেবল দেশীয় কম্পানির কথা যদি ধরি ওজিডিসি, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স মিলিতভাবে এ পর্যন্ত ১৮ টি অনুসন্ধান কূপ অনুসন্ধান করে ৮ টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। অর্থাৎ এদের মিলিত সাফল্যের হার ২.২৫:১ আর শুধু বাপেক্স অনুসন্ধান করে ৩ টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে অর্থাৎ সাফল্যের হার ১.৩৩:১ তেল গ্যাস উত্তলোনের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের জাতীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। এমনকি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষতাহীন বলে বহুজাতিক কম্পানির সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করতে সরকার দ্বিধা করেনা। অথচ আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যের হার ঐ বিদেশী কোম্পানিগুলোর চাইতেও বেশি। এই উদাহরন সাপেক্ষে আমরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারি সরকারের সহায়তা থাকলে আমাদের দেশে বিদ্যমান প্রযুক্তি দিয়েই কত কিছু করা সম্ভব। সরকারি সহায়তা পেলে এই প্রযুক্তি হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক মুক্তির উৎস। এ প্রসঙ্গে আরো উল্যেখ্য যে, যে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আমরা উন্নত মনে করছি তারাই অর্থাৎ অক্সিডেনটাল, নাইকো মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় পরিবেশ ও সম্পদ বিনাশকারী দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। অথচ পুরনো ও জীর্ণ জন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করলেও বাপেক্স, পেট্রোবাংলা বা দেশীয়কোন কম্পানির হাতেই এ ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের আর একটি শিল্প গার্মেন্টস ভয়াবহভাবে আমদানী নির্ভর। এই খাতে যে পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় বলে হিসাব দেখানো হয় বাস্তবে আয় তাঁর চেয়ে অনেক কম। যদি রফতানি করে আয় হয় ১০০ বৈদেশিক মুদ্রা তাহলে তাঁর ৭০ থেকে ৭৫ টাকার কাঁচামাল আমদানী করতে হয়। এই অবস্থা পরিবর্তন ও গার্মেন্টস শিল্পকে দেশে শক্ত ভিত দেবার প্রধান পথ হচ্ছে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা। এ শিল্পের প্রধান অংশ হোল সুতা, বস্ত্র শিল্প। এ খাতের বিকাশের জন্য সরকারী উদ্যোগ দরকার। সার্কভুক্ত দেশ, কার্যত ভারত থেকে সুতা আমদানী করা হয়। এভাবে টেকসই শিল্প হিসেবে গার্মেন্টস দাঁড়াতে পারবেনা। শুধু হবে কাঁচামাল আমদানি আর পাকা বা আধা পাকামাল রফতানী নির্ভর শিল্প।

হাইটেক লো পে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির বিপরীতমুখীসম্পর্ক; প্রযুক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কঃ

গত কয়েক বছরের প্রযুক্তির বিকাশের সারমর্ম করলে কয়েকটি ২টি বিষয় পাওয়া যায়।

  • প্রযুক্তিগত বিকাশ একটি অব্যাহত এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
  • প্রযুক্তিগত বিকাশ কি ধরনের কাজে ব্যাবহহৃত হবে তা নির্ভর করে বিদ্যমান ক্ষমতা ও মালিকানা ব্যবস্থার উপর।

বর্তমানে ইন্টারনেট প্রযুক্তি দুরত্ব মোচন, সময় সাশ্রয়ের যে সম্ভাবনা তৈরী করেছে তা এখনো প্রধানত কাজে লাগাচ্ছে এক চেটিয়ে ক্ষমতাধর শক্তিবর্গ। বাজার বিস্তার, বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র সন্ধান, প্রচার, অপপ্রচার, অপরাধের নেটওয়ার্ক তৈরি, যৌন বানিজ্যের অভূতপূর্ব সম্প্রসারন, ফাটকাবাজারি ব্যাবসার সম্প্রসারন ইত্যাদি কাজেই ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভির প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে বেশি। অবস্থা দারাচ্ছে এই যে স্যাটেলাইট, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি বিদ্যমান একচেটিয়ে মালিকানা ব্যাবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং খুবি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিনোদন ও তথ্য সাম্রাজ্যের অন্যতম একচেটিয়ে মালিক ট্রেড টার্নার বলেছেন যে “যোগাযোগ ও পরিবহন প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন জেভাবে ঘটাচ্ছে তা দরিদ্র মানুষের জীবন যাত্রার মান পরিবর্তনের হারের চাইতে অনেকগুন এগিয়ে আছে। ঘটনা এরকম যে, বিশ্বায়ন দ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে আর মানুষ তাকে দেখছে ধীর লয়ে।” বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ। নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে মাত্র ১৫ কোটি মানুষ বা ২.৫% মানুষ কম্পিউটার ব্যাবহারের সুযোগ পেয়েছে। এর কেন্দ্রীভবনও লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটি বা ১৫% মানুষের কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ আছে। এদের বেশিরভাগ কোন না কোন প্রতিষ্ঠানে ডাটা এন্ট্রির কাজে যুক্ত। মাত্র ২ কোটি বা ৮% মার্কিন জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যাবহার করে। এদের বড় অংশ চাকরির অংশ হিসেবেই ইন্টারনেট ব্যাবহার করে। বাংলাদেশে এই অনুপাত আরও কম। দশকের শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ২০০০এ মাত্র ১ জন। বর্তমানে এই হার সামান্য বেড়েছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ব্যাবহার বিন্যাস থেকে আমরা যে চিত্র পাই তা প্রত্যেক অঞ্চলের ভেতরের ভয়াবহ শ্রেণী বৈষম্যই স্পষ্ট করে তোলে। প্রযুক্তির যা কিছু বিকাশ হচ্ছে তার সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এই ব্যাবহার অপরাধ সৃষ্টিকারী খাত ও ধ্বংসাত্মক খাতেই বেশি হচ্ছে যাতে প্রকৃত আয়স্তরের কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেখানে অবসর বৃদ্ধি করার কথা, কাজের ভার কমানোর কথা সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে বেকারত্ব। দেখা যাচ্ছে পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের তুলনায় খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, আপেক্ষিকভাবে কম মজুরী। “হাইটেক লো পে” এখন যুক্তরাষ্ট্রে কেবল প্রচলিত বাক্য নয় বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রবণতার সাক্ষর। কাজেই বলা যায় প্রযুক্তির সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক বিপরীতমুখীও হতে পারে, এবং তা নির্ভর করে প্রযুক্তির ব্যাবহার এবং ব্যাবহারের উদ্দেশ্যের উপর।

প্রযুক্তি, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিঃ

প্রযুক্তির বিকাশ এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ এর বহুমুখী ব্যাবহার কোন অরাজনৈতিক বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে একটি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন কেমন হবে। প্রযুক্তি সেই উন্নয়নের একটি উপায় মাত্র। প্রযুক্তি থাকলেও সেই উন্নয়ন গনমানুষের কাছে নাও পৌছাতে পারে যদি তা বন্দী থাকে সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতে। এর প্রমান কিউবা। নারীর যে সকল রোগ তাঁদের জীবন বিপর্যস্ত করে ধনী দেশে তাঁর পরীক্ষা আর চিকিৎসার যে প্রযুক্তি তা সাধারন, প্রান্তিক নারীর নাগালের বাইরে। কিউবায় সেই প্রযুক্তি কেবল সুলভ এবং নিয়মিতই নয় সকল নারীর জন্য বাধ্যতামূলকও বটে। ব্রিটিশ নারীবাদী লেখক জারমেইন গ্রিয়ার কিউবা সফরে গিয়ে লিখেছিলেন যে যেসব জটিল টেস্ট করা ব্রিটিশ নারীদের অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব নয়, যেসব টেস্ট ব্যায়বহুল বলে এই ধনী রাষ্ট্র দায়িত্ব নেয়না, সেসব জটিল টেস্ট সকল কিউবান নারীর জন্য এ গরীবদেশ সহজলভ্য করেছে। কোন টাকা পয়সার ব্যাপার নেই। উদাহরন থেকে স্পষ্ট প্রযুক্তি যখন কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় তখন তা কতটা অমানবিক হতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য অন্যান্য মৌলিক অধিকারের খাতের যে ভগ্নদশা তা বিদ্যমান রেখে প্রযুক্তির বিকাশের প্রতিশ্রুতি প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর কোন দেশ বলেনা তারা ডিজিটাল দেশ গড়বে। যদিও কম্পিউটারাইজ করার ক্ষেত্রে বহু দেশ অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে তবুও এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোল সকলের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, কাজের অধিকার নিশ্চিত করা। এগুলো নিশ্চিত করলে মানুষ খুব সাধারনভাবেই প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো পাবে। বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষা চিকিৎসা নিশ্চিত নয়া করে তাঁর হাতে মোবাইল দেয়া অর্থহীন। বিদ্যুত নিশ্চিত না করে কম্পিউটার দেয়া অর্থহীন।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার?  

৬০ এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সবচাইতে গুরুত্ব দেয়া হয়। জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলে অন্যান্য সমস্যা আপনি সমাধান হবে বলে মনে করা হয়। সমাজের কতগুলো মানুষ যদি ধনী হয় তাহলে তা চুইয়ে পরা পদ্ধতিতে (ট্রিকেল ডাউন এফেক্ট)সমাজের বাকি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চাহিদা ধীরে ধীরে পুরন করবে। সবুজ বিপ্লব (গ্রিন রেভোলিউশন) এ সময়ের আরও একটি জরুরী ঘটনা। বাংলাদেশে এর প্রভাবে আমদানিকৃত প্রযুক্তি, রাসায়নিক সার, এইচ, ওআই, ভি বা উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রয়োগ বাড়তে থাকে। এর ফলস্বরূপ যান্ত্রিক সেচ ব্যাবস্থাও বাড়ে। বাংলাদেশের জৈব বৈচিত্রের উপর এর ফল ছিল ভয়াবহ। আর্সেনিক ও অন্যান্য উপসর্গ এই প্রযুক্তির হাত ধরেই আসে। ৬০এর দশক থেকে এই প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রিক চিন্তা প্রতিনিয়ত সংকটের মুখে পরতে থাকে যখন এর পরিবেশ বিধ্বংসী রূপটি সামনে হাজির হয়। আমদানিকৃত প্রযুক্তি আমাদের দেশে কৃষিতে নারীর ভূমিকা খর্ব করে। অথচ উন্নয়নশীল দেশে কৃষির ৫৫% এর বেশি কাজ নারী করে। প্রযুক্তির ছোঁয়া যত লাগলো নারীর পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি ছুড়ে ফেলে কৃষি হয়ে উঠলো পুরুষের কাজ। একই সাথে পরিবেশের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব প্রান্তিক নারীর জীবনধারণের জন্য হয়ে উঠলো চ্যালেঞ্জসরুপ। অনেকে বলে থাকে নারীর ক্ষমতায়নে গার্মেন্টস শিল্প এক অভাবনীয় দিগন্ত উন্মোচন করেছে। হাজার হাজার নারী শ্রমিকের নুন্যতম মজুরি ৪/৫ হাজার টাকা যাও থাকে বকেয়া। নারী বলেই বিশ্বের আর যে কোন দেশের তুলনায় এই বেতন এত কম। তাই প্রযুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নে কি ভূমিকা রাখবে তাঁর চাইতেও জরুরী প্রশ্ন হোল কার অর্থনৈতিক উন্নয়ন? কে ব্যাবহার করবে এই প্রযুক্তি? কি হারাতে হবে আমাদের এর বিনিময়ে?

তথ্যসুত্রঃ

১। ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম

২। আনু মুহাম্মদ, বিশ্ব পুঁজিবাদ এবং বাংলাদেশের অনুন্নয়ন, সংহতি প্রকাশন ২০০৭

৩। কল্লোল মোস্তোফা, মাহবুব রুবাইয়্যাত, অনুপম সৈকত শান্ত; জাতিয় সম্পদ, বহুজাতিক পুঁজি ও মালিকানার তর্ক, সংহতি প্রকাশন ২০১০

৪। আনু মুহাম্মদ, উন্নয়নের রাজনীতি, সূচীপত্র, ২০০৬

৫। আনু মুহাম্মদ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১১

৬। আনু মুহাম্মদ, বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা, বিশ্বায়িত পুঁজিবাদে ল্যাটিন আমেরিকা, শ্রাবণ প্রকাশনী ২০১১

৭। আনু মুহাম্মদের সাক্ষাৎকার, রোদেলা প্রকাশনী, ২০১১