বইঃ দা গোল্ডেন নোটবুক, লেখকঃ ডোরিস লেসিং 

ডোরিস লেসিং কমিউনিস্ট ছিলেন, এই ছবিটা সেই হিসেবে লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক :p মনে নাই কোন প্রোগ্রামের জন্য এই কাগজের বোমা বানানো হয়। বাথরুমের কাছে ফেলে রাখা ছিল। তখন তুলি ছবিটা।

ডোরিস লেসিং কমিউনিস্ট ছিলেন, এই ছবিটা সেই হিসেবে লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক :p মনে নাই কোন প্রোগ্রামের জন্য এই কাগজের বোমা বানানো হয়। বাথরুমের কাছে ফেলে রাখা ছিল। তখন তুলি ছবিটা।

প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার সুবৃহৎ এই বই সকল অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। ২য় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নারীবাদী দৃষ্টিতে দুনিয়ার সাথে বোঝাপরা করবার এক অসামান্য দলিল “গোল্ডেন নোটবুক”। লেখক আনা তার রাজনৈতিক জীবন, লেখা-লেখির জীবন, পারিবারিক জীবন আর ব্যাক্তিগত সম্পর্কের জীবনের নির্মোহ দলিল রাখতে চাইছেন ভিন্ন ভিন্ন রঙের ডাইরিতে। নিজের ভিতরের বিভাজনগুলোকে বিশ্লেষণ করে তিনি এক পুর্নাঙ্গ সত্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবেন। নানা ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক আর পারিবারিক সংঘাতের মধ্যে দিয়ে তার এই আশা পূর্ণ হয় কিন্তু লেখক আনা সিদ্ধান্ত নেন আর কোনদিন না লিখবার।

বইটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মনে রাখা জরুরী। ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, আফ্রিকার স্মৃতি যার অভিজ্ঞতায়, সৃষ্টিশীল কাজে তার প্রভাব থাকবেই। পুরো বইটার ভাষাভঙ্গি, বিস্তৃত বর্ণনায় আমার কানে এক হতাশাগ্রস্ত কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছে। যেন লেখক আনা একটা কিছুর সন্ধানে আছেন। বিপরীতকামী বলে হয়তো এই অনুসন্ধান তিনি তৃপ্ত করতে চেয়েছেন পুরুষ সঙ্গীদের মধ্যে, প্রেমে। তাদের প্রত্যেকেই তাকে নির্দয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে শারীরিকভাবে, আবেগজনিতভাবে। নিজের ব্যর্থ সম্পর্কের দরুন আনা বহুগামী, ভাজাইনাল আর ক্লিটোরাল অর্গাজমের মধ্যে সে বিভক্ত, বান্ধবীর আজাচারও তার কাছে গ্রহণযোগ্য। নিজের ভাড়াটিয়া হিসেবে সে সমকামী যুগলকে গ্রহন করতে পারে কিন্তু তাদের “আসল পুরুষ” মনে হয়না তার। “আসল পুরুষের” সংজ্ঞা তবে কি? বিপরীতকামী হওয়া? অথচ এই “আসল পুরুষরাই” তাকে যৌনতায় এবং আবেগে ক্রমাগত নিগ্রহ করেছে। এই আসল পুরুষদের প্রত্যেকেই একসময়কার বাম রাজনৈতিক কর্মী, প্রায় সকলেই বিবাহিত। আনার সাথে শারীরিক সম্পর্কের শুরুতে প্রত্যেকেই তাদের স্ত্রীদের কোন এুটির ঘোষণা দিবেন, যেন নিজেদের অন্যায্য সম্পর্কের লাইসেন্স করিয়ে নিচ্ছেন। এই আসল পুরুষদের কাছ থেকে শারীরিক, মানসিকভাবে অতৃপ্ত থেকেও আনাকে আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব মনে হয়। একইভাবে তাকে নীরব মনে হয় আফ্রিকার সেই দিনগুলোতে যখন পুরুষ কমরেডরা অসম সম্পর্কগুলো নিয়ে উচ্চকণ্ঠ থাকে। আনা তখনও নীরব যখন সে আর তার একমাত্র নারী কমরেড উপলব্ধি করে রাজনৈতিক দর্শন এক হলেও নারী হিসেবে তাদের জীবন বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা ভিন্ন এবং এ কারনেই তারা অনেক ক্ষেত্রে নীরবে উপেক্ষিতও। ৪০/৫০ এর দশকে পরিবর্তিত জীবন বাস্তবতায় নারী প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির আশ্চর্য নীরবতা, কঠোর হাতে ন্যায্য সমালোচনা দমনসহ অন্যান্য অসৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আনা নীরব দর্শকের মত অবলোকন করে। হয়তো সে সমগ্র সত্তা দিয়ে উপলব্ধি করে সিমন ডি বুভোয়ারের সেই বক্তব্যঃ শ্রেণী সংগ্রাম লিঙ্গ সংগ্রামকে অপসরণ করেনা।

লেখকের প্রাত্যাহিক জীবনের বর্ণনা আসে “ফ্রি উইমেন” নামের অধ্যায়গুলোতে। সমাজের দৃষ্টিতে হয়তো তারা “মুক্ত নারী” ছিলেন। চল্লিশোর্ধ নারী লেখক, রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয়, অবিবাহিত, এক সন্তানের মা সবগুলো বিশেষণই “মুক্ত/স্বাধীন নারীর” লক্ষণের মধ্যে পরে। কিন্তু ঘটনা যত অগ্রসর হয় বোঝা যায় সমাজের বেশিরভাগ মানুষই যখন অনগ্রসর আপাত দৃষ্টিতে “স্বাধীন নারীও” বাধ্য হন প্রতিনিয়ত পিছুটান বোধ করতে। নারী হিসেবে আমি উপলব্ধি করি নারীস্বাধীনতা নগদে পাওয়া কোন পন্য নয়। প্রতিনিয়ত “স্বাধীন নারীকে” তাঁর মুক্তির মুল্য দিতে হয়। নানা স্ববিরোধীতায় খণ্ড বিখন্ড থাকলেও একটা বিষয় স্পষ্ট বইয়ের কোন নারী চরিত্রই আর কোন পুরুষের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হতে চান না।নারীকে নিয়ে কাটাছেঁড়া, বিশেষায়ন, বিভাজন এতকাল পুরুষ করে এসেছে। আমি আশা করি নারীবাদের কলম এবার নারীবিদ্বেষী পুরুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করবে। সেই আলোকে বলতে হয় কোন পুরুষ চরিত্রকেই আমি বইয়ের আর সব নারী চরিত্রের মত এত সচ্ছভাবে পাইনি।

পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীতে, নিবিড়তম সঙ্গীদের দ্বারা অপমানিত, রাজনৈতিক ভাবে হতাশাগ্রস্ত, প্রায় অর্ধ উন্মাদ অবস্থায় আনা শেষবার যখন তার ডায়রি লিখতে বসে তখন এক পরাবাস্তব দৃশ্যের অবতারন ঘটে।চায়নার গরীব চাষী, আলজেরিয়ার বিপ্লবী, আফ্রিকার বর্ণবাদে নিষ্পেষিত মানুষেরা আক্ষরিক অর্থে আনার পেছনে এসে দাঁড়ায়। তারা জোর দাবি জানায় আনা যেন তাঁদের ভাষা দেয়। কিন্তু আনা ব্যর্থ হয় আর একটি লাইনেরও জন্ম দিতে। আসলে সময় ব্যর্থ করল আনাকে, একজন সৃষ্টিশীল মানবতাবাদী লেখককে।পড়তে পড়তে মনে প্রশ্ন জাগে সেই সময়টাই কি এত বন্ধ্যা ছিল? সেই বন্ধ্যা সময়কে নীরবে ধিক্কার জানাতে একজন লেখক সিদ্ধান্ত নিলেন আর কোনদিন কোন শিল্পের জন্ম না দেবার।

পৃথিবীর প্রথম যে নারী আত্মজীবনীর ঢঙে সাহিত্য রচনা করেছেন তিনি হয়তো জানতেননা ব্যক্তি নারীর ক্ষীণ কণ্ঠস্বরও বিশ্বদৃষ্টি হিসেবে জরুরী হয়ে উঠবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জীবন, সমাজ, রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করার অর্থ মানুষের সম্মিলিত শক্তির সম্ভাবনাকে খাটো করা নয়। বরং হাজারো অবহেলিত কণ্ঠস্বরগুলোকে এটা জানান দেয়া যে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো একই এবং এটাই আমাদের মিলন বিন্দু হতে পারে। নারীর অভিজ্ঞতার আলোকে ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাম রাজনীতির যে ব্যাখ্যা তা বাম রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকে তুচ্ছ করেনা। বরং একে আরও শক্তিশালি এবং নির্ভুল হবার সম্ভাবনা খুলে দেয়। বুভোয়ারের কথাতেই আমাকে ফিরতে হয়ঃ একজন নারীবাদী সংজ্ঞার্থেই বামপন্থী, তা সে নিজেকে বামপন্থী বলল কি বলল না, তাতে কিছু যায়-আসে না।